বিশ্বের অনন্য দৃষ্টান্ত বিনা মূল্যে পাঠ্য বই

বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও একটি ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিনা মূল্যের বই বিতরণে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। সারা বিশ্ব যা কখনো ভাবতেও পারেনি, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে। ছয় বছর ধরে একই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাক প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চার কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ জন শিক্ষার্থী বিনা মূল্যে পাবে ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টি বই। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো এবার প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুরাও পাবে ব্রেইল পদ্ধতির বই। ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই সকল জেলা ও উপজেলায় পৌঁছে যাবে এসব বই। বছরের প্রথম কর্মদিবসেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব শিশু হাতে পাবে নতুন বই। ফলে নতুন উদ্যম আর আগ্রহে শিশুরা শুরু করবে নতুন বছরের পড়ালেখা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিনা মূল্যে বই বিতরণ সরকারের বড় অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিপুলসংখ্যক বইয়ের ব্যবস্থাপনা, সময়মতো পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই বড় ব্যাপার। আর চার রঙের বই হওয়ায় মানও অনেক বেড়েছে। শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার- একটা বৈষম্য দূর হয়েছে। আগে ধনী লোকেরা বাজার থেকে বই কিনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু গরিবরা বই কিনতে পারতেন না। তারা তিন মাস পরে জোগাড় করতেন। এখন আর সেটা হয় না। শিক্ষাবিদ জাফর ইকবালের কথামতো, এক বছরের জন্য যে পরিমাণ বই ছাপানো হয় তা একটার পর একটা সাজালে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা যাবে। যথাসময়ে বিনা মূল্যের এই বই বিতরণ বিশ্বে একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত।’

জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বিতরণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে মাধ্যমিকের প্রায় ৯০ শতাংশ বই পৌঁছে গেছে বিভিন্ন উপজেলায়। তবে প্রাথমিকের বই পৌঁছানোর হার কিছুটা কম। ৬৫ শতাংশ বই পৌঁছেছে প্রাথমিকে। সে হিসেবে গড়ে ৭৭.৫০ শতাংশ বই গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আগামী ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বোর্ডের বিতরণ বিভাগ। যেসব ছাপাখানার কাজ বাকি আছে তারা দিন-রাত মুদ্রণ, বাঁধাইসহ সব কাজ করে চলেছে। এনসিটিবির পক্ষ থেকেও কঠোর তদারকি করা হচ্ছে। তবে ব্রেইল বই এবার প্রথমবারের মতো হওয়ায় এর সার্বিক দায়িত্বে আছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এ টু আই বিভাগ। আগামী বছর থেকেই এ কাজটিও হবে এনসিটিবির তত্ত্বাবধানে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে জানুয়ারির ১ তারিখেই শিশুদের হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্য বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আর বর্তমান সরকার তাদের আগের মেয়াদেও এই বই বিতরণ কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্ন করে যাচ্ছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসজুড়েই টানা হরতাল ও অবরোধ থাকার পরও চলতি বছর শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে তাদের বই পেয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ইবতেদায়ি ও দাখিলের তিন কোটি ৭৩ লাখ ৬৭২ শিক্ষার্থীকে ২৯ কোটি ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮৬টি বই দেওয়া হয়েছিল। এবার বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন কোটি। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে বিনা মূল্যে বিতরণকৃত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১২৪ কোটি। আর আগামী শিক্ষাবর্ষ হিসাব করলে ছয় বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে বিনা মূল্যে দেওয়া বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৫৭ কোটিতে, যা একটি মাইলফলক।

এনসিটিবির সচিব ব্রজ গোপাল ভৌমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরুর দিকে এত বই ছাপানো ও পৌঁছে দেওয়া ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যথাসময়ে বই হাতে তুলে দিয়ে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে এনসিটিবির সবাই আন্তরিক। এমনকি ছুটির দিনেও আমরা কাজ করতে পিছুপা হই না। তবে সরকারের আন্তরিকতা আর সহযোগিতায় এই মহৎ উদ্যোগ আমরা যথাসময়ে শেষ করতে পারছি। বিনা মূল্যের এত পরিমাণ বই পৃথিবীর অন্য কোথায়ও বিতরণ করা হয় না। অধিকাংশ দেশেই টাকা দিয়ে বই নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশই একমাত্র ব্যতিক্রম।’

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০১৫ শিক্ষাবর্ষের প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৬০ লাখ ১৬ হাজার ৫২৯ জন শিশুর জন্য ছাপানো হচ্ছে এক কোটি ২০ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮ কপি বই। প্রাথমিক শিক্ষায় দুই কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৩১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১১ কোটি ৫১ লাখ ৭১৫টি বই এবং ইবতেদায়ির ২৫ লাখ তিন হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থীর জন্য এক কোটি ৭৯ লাখ ৬৯ হাজার ৪২০ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষার এক কোটি চার লাখ ৬০ হাজার ৮৯৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১৪ কোটি ৮২ লাখ তিন হাজার ৩৯৩টি বই, এসএসসি ভোকেশনালের এক লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য ২১ লাখ ১২ হাজার ১৫৫ কপি বই এবং দাখিল ও ভোকেশনালের ২১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য তিন কোটি ৯ লাখ ২৯ হাজার ১৮২টি বই ছাপানো হচ্ছে।

জানা যায়, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির সব বই ছাপা হচ্ছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে। আর মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপতে এনসিটিবি কাগজ কিনে দরপত্রের মাধ্যমে মুদ্রাকরদের কার্যাদেশ দিয়েছে। এবার ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানসহ পাঠ্য বই মুদ্রণের কার্যাদেশ পেয়েছে মোট ২৩৮টি প্রতিষ্ঠান। এবার এনসিটিবি মোট কাগজ কিনেছে ১৯ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন।

তবে সব বই যথাসময়ে ছাপা হলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ‘কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা’ এবং নবম শ্রেণির ‘ক্যারিয়ার শিক্ষা’ ডিসেম্বরের মধ্যে পৌঁছানো নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। কারণ এই বই দুটির পাণ্ডুলিপিতে প্রচুর তথ্যবিভ্রাট, ভাষাগত ত্রুটিসহ নানা ধরনের সমস্যা পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে তা এনসিটিবিকে দিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।