‘নট আউট’ মমতাজ

মমতাজ উদ্দিন। বগুড়ার বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা। বয়স পেরিয়েছে ৭৩। এখনো দাপুটে। স্বাধীনতার পর থেকে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদ তাঁর কাছে এসে ধরা দিয়েছে বারবার। রাজনীতির ওই চৌকস পদ দুটিতে তাঁর বিচরণ ৪০ বছর। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এবারের সম্মেলনেও তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে সভাপতির ‘মসনদ’ এবারও তাঁর অপেক্ষায়। বগুড়ায় মমতাজের ‘বিকল্প নেতা’ তৈরি না হওয়া এবং ঘরোয়া কোন্দলে সিনিয়র নেতারা কোণঠাসা হয়ে থাকাই দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি বলে মনে করেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।

এদিকে দীর্ঘ ১০ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে কোটি টাকার ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুনে ঢাকা এখন বগুড়া শহর। তবে এই সম্মেলনকে ঘিরে উৎসবের পাশাপাশি শঙ্কাও রয়েছে নেতা-কর্মীদের মধ্যে; কারণ ঘরোয়া কোন্দল না মিটিয়েই আয়োজন করা হয়েছে সম্মেলনের। আর সম্মেলনে আলোচিত ব্যক্তি এখন আলহাজ মমতাজ উদ্দিন। আগামী ১০ ডিসেম্বর বগুড়া জিলা স্কুল মাঠে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ৬ আগস্ট সম্মেলনের মাধ্যমে মমতাজ উদ্দিনকে সভাপতি ও মজিবর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রথম অবস্থায় দলীয় কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি থাকলেও বছরখানেক পর গ্রুপিংয়ের কারণে কর্মকাণ্ড ছন্দ হারায়। এরপর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও গ্রুপিং, লবিং আর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে এখনো নতুন কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।

‘নট আউট’ মমতাজ

দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলটির কর্মকাণ্ড এখন চলছে সভাপতির আস্থাভাজন নেতা-কর্মী দিয়ে। দলের সিনিয়র নেতা যাঁরাই সভাপতির বিপক্ষে কথা বলেন, তাঁরাই তোপের মুখে পড়েন। তাই ভয়ে মুখ খুলতে চায় না কেউ।

একাধিক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেন, এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনু শেরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এ ছাড়া প্রথম দিকে যুবলীগের পুরো অংশসহ জেলা ছাত্রলীগের একটি অংশ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় দলীয় কর্মকাণ্ড থিতু হয়ে আসে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর সম্মেলন হওয়ার কথা। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অনাগ্রহ, সাধারণ সম্পাদকের উপজেলা পরিষদ নির্বাচিত হওয়া, সভাপতির একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং দলীয় কোন্দলসহ নানা কারণে নতুন কমিটি করতে পারেনি দলটি। ঠিক একই কারণে সভাপতি মমতাজ উদ্দিনেরও বিকল্প নেতা তৈরি হয়নি।

জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, সভাপতি মমতাজ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনু যেমন তাঁদের পদ ছাড়তে নারাজ, তেমনি কাউকে এই পদে বিকল্প হয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

জানা গেছে, বগুড়া সদরসহ গাবতলী, নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর পাঁচটি উপজেলায় দুটি করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং দলীয় কোন্দলের কারণে বগুড়া শহর কমিটি স্থগিত রয়েছে। পরে শহরে আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলেও অন্যগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব সমাধানের জন্য কেন্দ্রে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এই দীর্ঘ সময়ে নেওয়া হয়নি।

তবে বিভক্তি সম্পর্কে সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি আবু সুফিয়ান শফিক জানান, জেলা আওয়ামী লীগ যে কমিটি অনুমোদন দেবে সেটিই হবে বৈধ কমিটি। এই বাইরে কমিটি করার কোনো সুযোগ নেই। সেই হিসেবে বগুড়ার কোনো উপজেলায়ই কমিটি নিয়ে সমস্যা নেই।

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক টি জামান নিকেতা অন্যান্য দলের চেয়ে তাঁদের দলেই গণতন্ত্রের চর্চা বেশি হয় উল্লেখ করে জানান, আওয়ামী লীগের জেলা সম্মেলন করতে হলে প্রথমে সদস্য সংগ্রহ, গ্রাম কমিটি ও ওয়ার্ড কমিটি করতে হয়। কিন্তু বগুড়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। উপজেলা পর্যায়ে অনেক নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী দলের কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তার পরও আমরা চাই সব ভেদাভেদ ভুলে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি কমিটি হোক।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রাগিবুল আহসান রিপু জানান, দলে দীর্ঘদিনের যে সংকট রয়েছে তার এখনো সুরাহা হয়নি। এ কারণে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা চাচ্ছেন যে কেন্দ্রীয় নেতারা এসব ব্যাপারে সরাসরি জানুক। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘দলের জন্য অনেক করেছি। আমাকে ছাড়া দল অচল। আর এই শীর্ষ পদে এত দিন থাকতে পেরেছি সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন বলেই। আর জেলা আওয়ামী লীগে ত্যাগী নেতা বলে কেউ নেই। অধিকাংশই সুযোগসন্ধানী। দলের সংকটময় মুহূর্তে কাউকে পাওয়া যায় না। কিছুসংখ্যক নেতা আছেন, যাঁরা নিজেদের অনেক বড় নেতা ভাবেন। তাঁরাই মূলত কোন্দল সৃষ্টি করতে চান। তিনি বলেন, নেতা-কর্মীরা চাইলে আবার সভাপতি হব। ৭৩ বছর বয়সেও আমি দলের হাল ধরার জন্য প্রস্তুত আছি।’

মমতাজের কথার সুর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বলেছেন, মমতাজ উদ্দিন ছাড়া বগুড়ায় কর্মকাণ্ড চালানো মুশকিল। যারা বিরোধিতা করে তারা কেউ দলীয় কর্মকাণ্ডে নিয়মিত নন। দলের কোনো কাজে খরচও করতে চান না। এ কারণে সভাপতি হিসেবে মমতাজের কোনো বিকল্প নেই।