মালয়েশিয়ায় সরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানিতে গতি ফেরার আশা

নামমাত্র খরচে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি হয়েছিলেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। কিন্তু তাঁদের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর সরকারি প্রক্রিয়া (জিটুজি) থমকে গেলে। এতে ফের বেড়ে যায় অবৈধ যাত্রা। এই অবৈধ যাত্রা ঠেকাতে আবারও উদ্যোগী হয়েছে সরকার। বিভিন্ন খাতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া গতিশীল করতে আজ মঙ্গলবার মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জানা গেছে, তিনটি চুক্তি সামনে রেখে তিন দিনের সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। চুক্তি যা-ই হোক, এ সফরে সরকারি পর্যায়ে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে কতটা গতি ফেরাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী- সবার নজর এখন সেদিকে।

সফরে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি, পর্যটন, উচ্চশিক্ষা ও পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। চারটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর বাইরে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান বিষয়ে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হতে পারে। এ প্রটোকলের আওতায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের আরো কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুই বছর আগে সরকারি পর্যায়ে কম খরচে বছরে এক লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রথম ১৯ মাসে মাত্র পাঁচ হাজার ৩৪০ জন কর্মীকে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে সরকার। একপর্যায়ে প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়লে বিদেশে কাজের সন্ধানে যেতে ইচ্ছুক কর্মীরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। তাঁরা দালালের দ্বারস্থ হন। গত কয়েক মাসে সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের বেশ কয়েকটি যাত্রা আটকে দিয়েছে প্রশাসন।

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর ঘিরে কর্মীদের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জিটুজি পদ্ধতিতে গতি ফিরলে সাগরপথে অবৈধ যাত্রা নিঃসন্দেহে কমবে। শুধু বাগান বা কৃষি খাতে নয়, আরো নানা খাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী পাঠানোর যে প্রক্রিয়া চলছে, তা আলোর মুখ দেখলে বাংলাদেশি শ্রমিকরা লাভবান হবেন। দেশও লাভবান হবে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে শুধু কৃষি বা প্ল্যান্টেশন খাতে কর্মী নেওয়া হতো। এখন সব সেক্টরেই কর্মী নেওয়া হবে। ওই দেশে রাবার ফিল্ড, কনস্ট্রাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং, সার্ভিস, গার্মেন্ট খাতসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর জনশক্তি প্রেরণে আগের মতো গতি ফিরবে বলে আশা করি।’

এ প্রসঙ্গে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯ অক্টোবর ১৭১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে থাইল্যান্ডের জঙ্গল থেকে থাই কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করে। সমুদ্রপথে ট্রলারে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি জনমনে গভীর ছাপ ফেলেছে। সমুদ্রপথের দালালচক্র খুবই ভয়ানক, তারা মানুষকে বিভিন্ন দেশে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার হার বাড়লে অবৈধ পথে কর্মী যাওয়ার পরিমাণ কমবে।

অভিবাসনবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা শিক্ষা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রমের (শিসউক) নির্বাহী পরিচালক ফখরুল মিল্লাত মোর্শেদ বলেন, ‘প্রতিবছর যোগ হচ্ছে নতুন কর্মশক্তি, যারা দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য চেষ্টা চালায়। বৈধ পথে যেতে না পেরে দালালদের মাধ্যমে তারা অবৈধ পথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় জিটুজি পদ্ধতিতে কর্মী যাওয়ার হার বাড়লে সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাওয়ার হার কমবে।’

প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের দিকনির্দেশনা ঠিক করতে গত মাসে মালয়েশিয়া সফর করে প্রবাসীকল্যাণ ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। দফায় দফায় বৈঠক করে তারা জিটুজি পদ্ধতি নিয়ে অগ্রগতিমূলক আলোচনা করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, মালয়েশিয়ায় জনশক্তি পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গতি আনতে বাংলাদেশ দেশটির সহযোগিতা চাইতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। সেখানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন। মালয়েশিয়া থেকে আমাদের প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশভিত্তিক রেমিট্যান্স তালিকায় পঞ্চম বৃহত্তম। এ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ বিবেচনায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্রের প্রসার এবং কর্মী নিয়োগের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে এ সফরে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হবে।’
সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক চেষ্টায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলেছে। সরকারি পর্যায়ে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া কিভাবে আরো গতিশীল করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে এ সফরে মালয়েশীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৩০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।

প্রসঙ্গত, ব্যাপক অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০৯ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত চেষ্টায় মালয়েশিয়া সরকার বনায়ন খাতে জিটুজি পদ্ধতিতে কর্মী নিতে আগ্রহ দেখায়। দীর্ঘ চার বছর পর ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সরকারিভাবে কর্মী প্রেরণের বিষয়ে সমঝোতা হয় বাংলাদেশের। শুরু থেকে এর বিরোধিতা করছে বেসরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা। তাদের বিরোধিতার মুখেই ২০১৩ সালের মার্চ মাসে কর্মী পাঠানো শুরু করে সরকার।