লাইলি-মজনু, বানানা-ম্যাংগো

 

গাছের গায়ে নাম লেখা ‘লাইলি-মজনু’। তবে এ নামের ইতিহাস তাত্ক্ষণিকভাবে জানা গেল না। ইয়া মোটা হয়ে গুঁড়িতে পানি জমিয়ে রাখে, এমন গাছ ‘বাওবাব ট্রি’। দেখতে কলার মতো, খেলে আমের স্বাদ।  নাম জানা গেল ‘বানানা-ম্যাংগো’। একটি ছোট ঔষধি গাছের নাম ‘হাড়জোড়া’, পাতাগুলো জোড়া দেওয়া হাড়ের মতো।
এমন সব মজার গাছ আর ফলের মেলা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসা জাতীয় বৃক্ষমেলায়। এ বছর মেলার প্রতিপাদ্য, ‘অধিক বৃক্ষ অধিক সমৃদ্ধি’। ৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত মেলা চলবে। প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকে।
মেলায় গিয়ে তথ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত মেলায় সারা দেশ থেকে আসা ১১০ নার্সারি ও প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ১৯টি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া পাঁচটি বেসরকারি সংস্থা ও ৮৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন নার্সারি রয়েছে।
সামাজিক বন বিভাগ ঢাকার ফরেস্ট রেঞ্জার ও মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. মনিরুজ্জামান জানান, মেলায় বনজ, ভেষজ, ফলদ ও শোভাবর্ধক—এই প্রধান চারটি শ্রেণিতে ৩০০ প্রজাতির বেশি গাছ রয়েছে। প্রতিটি প্রজাতির আছে পাঁচ থেকে ২৫টি জাত। মেলায় বিভিন্ন গাছের পাশাপাশি চারা উত্পাদন ও পরিচর্যার উপকরণ, সার ও কীটনাশকের স্টল রয়েছে।

বাংলাদেশ প্লান্ট নার্সারিম্যান সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও রাঙাবন নার্সারির মালিক মো. মেজবাহউদ্দিনের দাবি, তাঁদের সমিতির আওতাধীন নার্সারির স্টলগুলোতে অন্তত ৬০০ প্রজাতির গাছ রয়েছে। জাত রয়েছে দুই হাজারের বেশি।

মেজবাহউদ্দিন দাবি করেন, মেলায় ক্রেতাদের মোটামুটি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরম আর তেমন প্রচার নেই বলে মানুষ জানতে পারছে কম। তিনি বলেন, ‘ধীর ধীরে দর্শনার্থী বাড়বে বলে আশা করছি। আমরাও সমিতির পক্ষ থেকে র্যালি করার চিন্তা করছি।’

মেলা উপলক্ষে সমিতির পক্ষ থেকে বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো লক্ষ্যমাত্রা আছে কি না, জানতে চাইলে মেজবাহউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য পাঁচ কোটি টাকার গাছের চারা বিক্রি করা।’

মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে জানা গেছে , সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দর্শনার্থী কম থাকলেও বেলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থী বাড়তে থাকে।

মেলার ২০-২১ নম্বর স্টলে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রদর্শনী। বিএডিসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক ও স্টলের প্রায়োগিক কর্মকর্তা জয়তুন নাহার বলেন, ‘আমাদের স্টলে প্রায় ৬০ প্রজাতির ও ১০০ জাতের বৃক্ষ রয়েছে। চারা-কলমও বিক্রি করি। ক্রেতাদের চারা লাগানোর পদ্ধতি ও পরিচর্যা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি।’

মেলায় সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে জয়তুন নাহার বলেন, গত কয়েক দিনের গরমের কারণে মানুষের ভিড় গত বছরের তুলনায় একটু কম। তা ছাড়া এবার মেলা নিয়ে প্রচারও কম হয়েছে।

ঢাকার মিরপুরের নার্সারি কিংশুক গ্রীন হাউসের স্টলে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সিরাজউদ্দিন জানান, তাঁদের বিক্রি ভালো হচ্ছে। তাঁদের কাছে ৪৯ ধরনের বিলুপ্তপ্রায়, বিদেশি ও বিরল প্রজাতির এবং এক হাজার জাতের  উদ্ভিদ রয়েছে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে বনসাই দিয়ে তৈরি বাংলাদেশের মানচিত্র, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের প্রথম সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি।

নাম প্রকাশে না করার শর্তে মেলার প্রচারণা কমিটির সঙ্গে যুক্ত বন সংরক্ষক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, মেলার যথাযথ প্রচারণা হয়েছে। প্রতিবছর যা করা হয়, এবারও তা-ই করা হয়েছে।

মেলায় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সহধর্মিণী তাসমিমা হোসেনের সঙ্গে দেখা  হলে তিনি জানান, সাভারে তাঁদের বাগানের জন্য গাছ কিনতে এসেছেন। তিনি মেলা থেকে বনজ, ভেষজ, ফলদ ও শোভাবর্ধনকারী বিভিন্ন ধরনের গাছ কিনেছেন ।

মেলার দর্শনার্থী ভারতীয় নাগরিক সিপিটিউর পরামর্শক রবি শেখরের ভাষ্য, মেলা ঘুরে অনেক ভালো লাগছে। হাতে ছোট একটি অর্কিড দেখিয়ে বলেন, ছোট গাছের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেশি।

শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ইসমাত সাদিয়া জানান, মেলায় অনেক ধরনের গাছ সম্পর্কে জানা যায়, চেনা যায়। দুর্লভ গাছও কেনা যায়। তাই প্রতিবছরই মেলায় আসেন।

মেলায় ৩০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি বৃক্ষ, ২৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির শোভাবর্ধক গাছ, ৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ গাছ, এক হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ গাছ, দুই হাজার থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বনসাই ও  ১০০ থেকে ২৫ হাজার  টাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অর্কিড পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশি গাছ ও চারার দাম একটু বেশি। মেলায় ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিদেশি গাছ পাওয়া যাচ্ছে ।

যাঁরা বেশি চারা কিনতে চান, তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মেলায় গিয়ে তাঁরা ফরমাশ দিলে নার্সারি থেকে চারা সরবরাহ করা হয় ।

মেলা মাঠের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। বনায়নে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ও গাছগাছড়ার বিভিন্ন উপকারী দিক জানাতে প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। অনুষ্ঠানে জারিগান, সারিগান, আঞ্চলিক গান পরিবেশ করা হয়। থাকে কবিতা আবৃত্তি, বক্তৃতা ও আলোচনা সভা।

মেলার তথ্যকেন্দ্রের বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ৫ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ৬৮ হাজার ২১৬টি চারা বিক্রি হয়েছে, যার মূল্য ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪৭১ টাকা। গত বছর মেলায় আট লাখ ৫০ হাজার চারা বিক্রি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। এবার তাদের লক্ষ্য ১০ লাখ চারা বিক্রি,  যার মূল্য অন্তত সাত কোটি টাকা।