বাংলাদেশে এবার হেক্সা ও অক্টোকপ্টার

স্বপ্নের পালে প্রতিনিয়ত নতুন হাওয়া জোগাচ্ছেন তারা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রোন টিম। দেশে এই প্রথমবারের মতো ড্রোন তৈরির এ কারিগররা আবারও চমকে দিতে নতুন কিছু নিয়ে আসছেন।

ড্রোন তৈরি করে একসময় আলোচনায় উঠে এসেছিলেন এই তরুণরা। এবার কাজ চলছে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে আকাশে টানা কয়েক ঘণ্টা উড়তে সক্ষম ‘মিলিটারি ড্রোন’ তৈরির কাজ। পুরোপুরিভাবে এ ড্রোন তৈরির কাজ শেষ করতে পারলে দেশের সাফল্য গাঁথার ইতিহাসে যুক্ত হবে নতুন আরও একটি পালক।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রোন টিমের প্রধান সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিলের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় এই লেখকের। ওই সময়ই ড্রোন টিমের এই নতুন উদ্ভাবনী ভাবনার কথা জানালেন নাবিল।
তিনি বলেন, ‘দেশে প্রথমবারের মতো ৬ পাখাওয়ালা হেক্সাকপ্টার এবং ৮ পাখাওয়ালা অক্টোকপ্টার তৈরি করেছেন তারা। এই হেক্সাকপ্টার ও অক্টোকপ্টার দিয়ে ভারী মালপত্র দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরিবহন করা যাবে সহজে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের রসদ সরবরাহ, অ্যামিউনিশন সরবরাহ কিংবা শত্রুপক্ষের আস্তানায় আচমকা হানা দিয়ে আক্রমণ_ সবটাই করা যাবে এই হেক্সা ও অক্টোকপ্টার দিয়ে। চাইলে এগুলোকে লাগানো যাবে গোয়েন্দাগিরির কাজেও।’
নাবিল আরও জানান, এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশের প্রথম গ্রাউন্ড কন্ট্রোল বেজ্ড ড্রোন তৈরির কাজ চলছে। গত সেপ্টেম্বর মাসেই সাস্ট ড্রোন টিম তাদের নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশন এবং সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফিক্সডউইং এবং মাল্টিরোটর ড্রোন ওড়াতে সক্ষম হয়। এমনকি অটোনোমাস সিস্টেমেও ড্রোন উড়িয়েছে এই টিম। অনেকেই যখন বিদেশ থেকে কিনে আনা দামি দামি আরসি কন্ট্রোলার দিয়ে ড্রোন উড়াতে ব্যস্ত, তখন সাস্ট-এর ড্রোন টিম যতটা সম্ভব দেশীয় প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ড্রোন বানানোর কাজ করছে।
ড্রোন গবেষণা প্রজেক্টের টিম লিডার সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিল। ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করাচ্ছেন তিনি। তার হাত ধরেই সম্প্রতি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিম উদ্ভাবন করেছে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই ড্রোন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন নাবিল।
শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের তত্ত্বাবধানে শাবিপ্রবির ড্রোন টিমে কাজ করছেন রবি কর্মকার, আখলাকুজ্জামান আশিক, মারুফ হোসেন রাহাত এবং তোহা। এ ছাড়াও তাদের সঙ্গে কাজ করছে ১৪ জনের একটি জুনিয়র টিম।
প্রথম দিকের গবেষণার কথা জানাতে গিয়ে নাবিল বলেন, ‘প্রথমে শুধু ‘ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফট’ আরসি কন্ট্রোলারের মাধ্যমে উড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েই গবেষণা হয়। এরপর সেটাকে ড্রোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে কাজ শুরু করি। কোনো আনমেন্ড এয়ারক্রাফটকে তখনই ড্রোন বলা যাবে, যখন সেটি কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে সক্ষম এবং সেটিকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে পরিচালনা করা যায়। আর এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই সাস্ট ড্রোন টিম গবেষণা কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। একই সঙ্গে ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফটের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাল্টিরোটর এয়ারক্রাফট তৈরির কাজও চলে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘ড্রোন কন্ট্রোল স্টেশন’ নির্মাণাধীন রয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের ওপর। এটি পুরোপুরিভাবে নির্মিত হয়ে গেলে এখান থেকেই দেশের যে কোনো জায়গায় ড্রোন উড্ডয়ন সম্ভব হবে। তবে আপাতত পোর্টেবল স্টেশন থেকে ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ড্রোন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ফান্ড পেলে এই রেঞ্জ আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব।’
পোর্টেবল স্টেশন ব্যবহার করে ড্রোনের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দেশে প্রথমবারের মতো পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ করেছেন বলেও জানালেন নাবিল। ভবিষ্যতের আকাশে রঙধনুর বর্ণচ্ছটাও দেখালেন নাবিল। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে পুরোটা না বললেও যেটুকু বললেন, তার সারমর্ম এই ‘আমরা এখন ড্রোন কন্ট্রোল স্টেশন থেকে টানা উড়তে পারে এরকম মিলিটারি ড্রোন তৈরির কাজ করছি। আর এটা যদি পুরোপুরি সম্ভবপর হয়, তবে সেটা হবে একটি মাইলফলক। এই ড্রোনের জন্য বিশেষ ধরনের যোগাযোগ সিস্টেম বাস্তবায়ন করছি আমরা, যে সিস্টেমে দেশের যে কোনো জায়গায় বসেই ড্রোন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী শাবিপ্রবির ড্রোন টিম। ড্রোন দিয়ে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি তাদের মালপত্র পরিবহন করতে চায়, তবে সে কাজেও আগ্রহ আছে তাদের। তবে শাবিপ্রবির এই ড্রোন টিমের সীমাবদ্ধতা একটাই_ বাজেট। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে তাদের গবেষণার কাজ কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানালেন সৈয়দ রেজওয়ানুল হক নাবিল। বর্তমানে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে পাওয়া ফান্ড নিয়েই গবেষণা কাজ চলছে বলে জানালেন তিনি। তবে যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক এই তরুণ দল এগিয়ে যেতে চায়। বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চায়_ বাংলাদেশও পারে।

স্বপ্নের পালে প্রতিনিয়ত নতুন হাওয়া জোগাচ্ছেন তারা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রোন টিম। দেশে এই প্রথমবারের মতো ড্রোন তৈরির এ কারিগররা আবারও চমকে দিতে নতুন কিছু নিয়ে আসছেন। দেশে প্রথমবারের মতো এ টিমের সদস্যরা তৈরি করেছেন হেক্সা ও অক্টোকপ্টার।