বাংলাদেশ এশিয়ার পরবর্তী জ্বালানি পরাশক্তি?

মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত মামলায় জয় এসেছে আগেই। সবশেষ জাতিসংঘের সালিশি আদালতের রায়ে ভারতের কাছ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র-এলাকা জিতেছে বাংলাদেশ। নতুন এ সমুদ্রসীমা হিসাবে নিলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুমিত মজুদ এখন ২২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ। এ কারণে অনেকে বাংলাদেশকে এশিয়ার পরবর্তী জ্বালানি পরাশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছে। গতকাল এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাপানের টোকিওভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, রাজনৈতিক উত্তেজনা, দুঃসহ দারিদ্র্য ও ভীষণ রকম ভর্তুকির ভারবাহী অর্থনীতি জ্বালানি-অবকাঠামোয় সরকারের বিনিয়োগের ক্ষমতা হ্রাস করায় অনেকে এখনো বাংলাদেশে অর্থ লগ্নিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। জরিপ ও আহরণের সমন্বিত পরিকল্পনা, পরিবেশগত বিপর্যয় রোধের প্রস্তুতি, জ্বালানি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে পারলে বাংলাদেশ এ সম্পদের সদ্ব্যবহারের পাশাপাশি এশিয়ার পরবর্তী জ্বালানি পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশের জলসীমায় খননকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলার দেয়া প্রস্তাবে ২০১২ সালে মাত্র দুটি কোম্পানি সাড়া দিয়েছিল। ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কনোকোফিলিপস ছাড়া কোনো কোম্পানি প্রতিযোগিতায় নামেনি। গত এপ্রিলে বিরোধমুক্ত জলসীমায় খনন ও অনুসন্ধান কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও ভালো সাড়া মেলেনি। কনোকোফিলিপস ও রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত স্টাটঅয়েল যৌথভাবে গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের তিনটি ব্লকের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো খননকাজের ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার বেঁধে দেয়া শর্তাবলিতে আপত্তি জানিয়েছিল।

এদিকে চলতি বছরের শেষে নতুন ১৮টি ব্লকের জন্য দরপত্র আহ্বান করবে পেট্রোবাংলা। সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের পলিসি অ্যাসোসিয়েট নিল ভাটিয়া মনে করেন, এর ফলে বাংলাদেশ পরিণত হবে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্পাদনকারী বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ রাষ্ট্রে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে হলে বাংলাদেশের কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানি খাতের বড় খেলুড়ে হতে হলে বাংলাদেশের চাই জরিপ ও খননকাজের সমন্বিত পরিকল্পনা। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। প্রশিক্ষিত সমুদ্রবিশারদদের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি জ্বালানি নিঃসরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষার আইনও নেই। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি পরীক্ষামূলক খননকাজ করলেও প্রয়োজনীয় অর্থ ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে সংস্থাটির।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে খনন চালাতে গেলে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি থাকে। বঙ্গোপসাগরে মিথেন নিঃসরণ ঠেকাতে হলে বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কারিগরি সহায়তা নিতে হবে বাংলাদেশকে। এ বিষয়ে নিল ভাটিয়া মনে করেন, সাগরে বিপর্যয় না ঘটিয়ে নিরাপদে গ্যাস আহরণের জন্য কনোকো ও স্টাটঅয়েলের সঙ্গে নিজেদের উত্পাদন চুক্তিকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। এছাড়া জ্বালানি খাতের বড় বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে। পেট্রোবাংলার সঙ্গে গ্যাসের দাম নিয়ে বিদেশী কোম্পানিগুলোর মতপার্থক্য দূর করতে হবে। ভাটিয়া মনে করেন, জ্বালানি সম্পদের ব্যাপক ভিত্তিতে আহরণ নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে দামের ক্ষেত্রে সংস্কার করতে হবে।

সমস্যা রয়েছে দেশের অর্থনীতির ধরনেও। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ১৯০ কোটি ডলার। বিশাল এ ভর্তুকি পরিহার করলে মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতিসহ নানামুখী সংকট মোকাবেলা করতে হবে সরকারকে। সরকারি খাতে দুর্নীতি জ্বালানির সম্ভাবনার পথে বাধা হতে পারে। দুর্নীতি না কমলে অতিরিক্ত এ সম্পদের প্রাপ্তি ও আহরণের সুফল দেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী পাবে না। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ককেও বিশ্লেষকরা জ্বালানি সম্ভাবনার পথে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। ভাটিয়া বলেন, আগামী দিনগুলোয় বিশ্বব্যাপী, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বাড়বে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের দ্বারস্থ ক্রেতার অভাব হবে না। দারিদ্র্য থেকে উত্তরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সরকার ও রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশকে এখনই এ সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের পদক্ষেপ নিতে হবে।