পাঁচ গুণ বেড়েছে সবজি উৎপাদন

দেশে রীতিমতো সবজিবিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। গত এক দশকে বাংলাদেশে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও)।
একসময় ভালো স্বাদের সবজির জন্য শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। টমেটো, লাউ, কপি বা নানা পদের শাক শীতকাল ছাড়া বাজারে মিলতই না। গ্রীষ্মকাল ছিল সবজির আকালের সময়। গত এক যুগে পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন প্রায় সারা বছরই ২০ থেকে ২৫ জাতের সবজি খেতে পারছে দেশের মানুষ। কৃষকেরা সারা বছরই নানা ধরনের সবজির চাষ করছেন।
যদিও গত এক যুগে দেশের কৃষিজমির পরিমাণ বাড়েনি, তার পরও সবজির জমির পরিমাণ বাড়াচ্ছেন কৃষকেরা। দেশে বর্তমানে এক কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, এই কৃষক পরিবারগুলোর প্রায় সবাই কমবেশি সবজি চাষ করে। জমির পাশের উঁচু স্থান, আইল, বাড়ির উঠান, এমনকি টিনের চালাতেও এ দেশের কৃষকেরা সবজির চাষ করছেন। এমনও দেখা গেছে, ফলবাগান ও বাড়ি-রাস্তার পাশের উঁচু গাছের মধ্যেও মাচা করে সবজির চাষ করছেন অনেক কৃষক। ফলে মোট কৃষিজমির পরিমাণ কমলেও সবজি চাষের এলাকা বেড়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সবজির উৎপাদন যেমন বেড়েছে, ভোগও তেমনি বেড়েছে। গত এক যুগে দেশে মাথাপিছু সবজির ভোগ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। পাশাপাশি সবজি রপ্তানি করেও মিলছে বৈদেশিক মুদ্রা। গত এক বছরে শুধু সবজি রপ্তানি আয়ই বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ।
সরকারি হিসাব তো আছেই, আন্তর্জাতিক তুলনায় গেলেও রীতিমতো গর্ব করার মতো তথ্য বেরিয়ে আসে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুক-২০১৩ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে বাংলাদেশে, বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের পরেই রয়েছে নেপালে, ৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সিরিয়ায়, ৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
পাশাপাশি একই সময়ে সবজির মোট উৎপাদন বৃদ্ধির বার্ষিক হারের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এখানে উৎপাদন বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। শীর্ষ স্থানে থাকা উজবেকিস্তানে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নেপালে এই হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
একসময় দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজির চাষ হতো। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজির চাষ হচ্ছে। এখন দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজই দেশে উৎপাদিত হচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী দেশের সবজিবিপ্লব নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাত এবং সরকারের বিভিন্ন সহায়তার সঙ্গে কৃষকের পরিশ্রম যুক্ত হয়েই এই সফলতা এসেছে। তবে আগামী দিনের পুষ্টিনিরাপত্তায় সবজি উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। এ জন্য আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনের দিকে আমাদের যেতে হবে।’
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালকের উপদেষ্টা এবং অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, তা সম্ভব হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কারণে। ফলে বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বীজ আমদানি এবং দেশে উৎপাদন করেছে। আর কৃষক সৃজনশীল উপায়ে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছেন।
পরিবারই ভরসা, বাড়ছে রপ্তানি: দেশের অন্যতম প্রধান সবজি আলুর ভোক্তা এত দিন ছিল দেশের মানুষই। গত বছর রাশিয়ায় প্রায় ২৫ হাজার টন আলু রপ্তানি হয়েছে। গত সপ্তাহে ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির আগ্রহ দেখিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। অথচ এর আগে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে এক কোটি ৩৮ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। আর আলু উৎপাদনের পরিমাণ ৯৬ লাখ টন। গত তিন বছরে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ১৯৬০ সালে যেখানে কৃষি পরিবারের সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৬২ লাখ। এই কৃষকদের প্রায় সবাই পারিবারিকভাবেই উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক সবজি খাওয়া বা ভোগের পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) হিসাবে গেল বছর দেশে মাথাপিছু সবজি ভোগের পরিমাণ হয়েছে ৭০ গ্রাম। তবে এখনো বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। জাতিসংঘের এই সংস্থাটির হিসাবে একজন মানুষকে দৈনিক ২২৫ গ্রাম সবজি খেতে হবে।
কী করে এই সাফল্য: দেশে সবজি উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে উন্নত বীজের ব্যবহার। দেশে টমেটো, লাউ, কপি, উচ্ছে, গাজরসহ বেশির ভাগ সবজি প্রায় সারা বছরই পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা গ্রীষ্মকালীন টমেটো, পেঁয়াজ, লাউ, করলাসহ বেশ কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। বেসরকারি বেশ কয়েকটি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বছরে বীজের চাহিদা সাড়ে চার হাজার টন, যার ৭০ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারজাত করে। এই বীজের ৬০ শতাংশ হাইব্রিড জাতের এবং বাকি ৪০ শতাংশ বারির বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আধুনিক ও দেশি জাতের।
বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মাহবুব আনাম প্রথম আলোকে বলেন, ২০ বছর ধরে দেশে বীজের চাহিদা সাড়ে চার হাজার টনই রয়েছে। তবে আগে বেশির ভাগ বীজ ছিল দেশি জাতের। এখন হাইব্রিড এবং আধুনিক জাতের বীজ আসায় উৎপাদন বেড়েছে।
রপ্তানিতেও এগিয়ে: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবজির রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সবজি যায় সৌদি আরবে। এর পরেই রয়েছে কাতার, ওমান, আরব আমিরাত, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে আগের চেয়ে উন্নত মানের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। তাই আমাদের পক্ষে রপ্তানি করা সহজ হয়েছে। তবে এখনো বাংলাদেশের সবজির প্রধান ক্রেতা প্রবাসী বাংলাদেশি, ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের প্রবাসীরা।’
মোহাম্মদ মনসুর আরও বলেন, ‘ইউরোপ ও আমেরিকার সুপারস্টোরগুলোতে আমরা এখনো প্রবেশ করতে পারিনি। সরকার যদি সবজির জন্য কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ হিমাগার ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ পরিবহনের ব্যাপারে সহযোগিতা করে, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বের সবজি বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারবে।’