মাছ উৎপাদনে চতুর্থ বাংলাদেশ

জাতিসংঘ সংস্থার প্রতিবেদন

‘মৎস্য ধরিবো খাইবো সুখে, কী আনন্দ লাগছে বুকে’।

নব্বই দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত মাছ চাষবিষয়ক বিজ্ঞাপনের এই স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়া এখন আর স্বপ্ন নয়। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। জাতিসংেঘর খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এ বছরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে।
এফএও বিশ্বের মাছ চাষ পরিস্থিতি নিয়ে ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার’ নামে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটির প্রচ্ছদে বাংলাদেশের রাজশাহীর একটি পুকুরে চার মাছচাষির মাছ ধরার একটি আলোকচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু প্রচ্ছদেই নয়, প্রতিবেদনটির ভেতরে পুকুর ও জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মৎস্যজীবীদের সাফল্য বারবার উদাহরণ আকারে উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন প্রথম এবং এর পরই রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছচাষিদের এই সাফল্য এসেছে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে। সরকারের কৃষিঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে মাছচাষিরা এখনো অবহেলাই পেয়ে আসছেন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারের বিতরণ করা ১৪ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণের মাত্র ১০ শতাংশ পেয়েছেন মাছচাষিরা। ধান বা পাট রাখার জন্য সরকারি গুদাম থাকলেও মাছচাষিদের জন্য এখনো নির্মিত হয়নি কোনো হিমাগার। তার পরও এই খাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ বলছে এফএও।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক মৎস্যসচিব জেড করিম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবেশ ব্যবস্থা মিঠাপানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। এখানকার আড়াই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় আর গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মাছ চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সরকার যদি মাছ চাষে আরও মনোযোগী হয়, চাষিদের সহায়তা করে, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে।
এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ৩৪ লাখ ৫৫ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে চাষ করা মাছের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টন। জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টন হয়েছে।

মাছের দাম সাধারণ ক্রেতাদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকায় গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ শতভাগ বেড়েছে। ২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপ অনুযায়ী বছরে বাংলাদেশের একেকজন মানুষ প্রায় ১২ কেজি মাছ খায়। চট্টগ্রামের অধিবাসীরা মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি ১৭ কেজি এবং রংপুরের অধিবাসীরা সবচেয়ে কম সাড়ে সাত কেজি মাছ খায়। এই মাছের ৭৬ শতাংশই আসে পুকুর ও জলাশয় থেকে। বিশ্বে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ ২২ দশমিক ৪ কেজি।

বাংলাদেশের মৎস্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত মাছের জাত এবং তা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে মাছের উৎপাদন এতটা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লা জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছ চাষ রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে।

মাছ চাষ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে মাছ খাওয়ার পরিমাণও গত ১০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। আর মাছ রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৩৫ গুণ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের হিমায়িত মৎস্য রপ্তানির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে চার হাজার ১৪৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তিন দশকের তিন ধরন: আশির দশকে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের পাঙাশ, রুই, কাতল, তেলাপিয়া চাষ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত জাতের কই, শিং, মাগুর, শোল মাছের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষকৃত মাছ উৎপাদিত হয়েছিল এক লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে ছয় লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০১৪ সালে এসে তা ১০ লাখ টন ছুঁইছুঁই করছে।

মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা জেলা দেশে তো বটেই, বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে। খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, চট্টগ্রামের চকরিয়া ও বরিশাল বিভাগে ঘেরে মাছ চাষ এসব এলাকার অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এসব এলাকায় উৎপাদিত চিংড়ি মাছ এখন দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য।

মাছে-ভাতের দিন ফিরছে: একসময় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বাস্তব। এফএওর হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৫৭ শতাংশ শুধু মাছ থেকেই মেটানো হয়।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে দেশে উৎপাদিত সব পণ্যের দাম ২ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। শুধু রুই, পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছের দাম বাড়েনি। আবার কই ও মাগুর মাছের দাম কিছুটা কমেছে। উৎপাদন বেড়ে যাওয়া দাম কমার কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আখতার আহমেদ মনে করেন, সরকারের কোনো মহাপরিকল্পনা ছাড়াই মাছ চাষে সাফল্য এসেছে। মূলত মাছচাষিদের সাহস ও সৃজনশীলতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে চাষিরা উৎপাদনে যান। ফলে তা টেকসই হয়েছে।

এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন।

এফএওর হিসাবে সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। তবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ

জাটকা সংরক্ষণের ফলে ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন থেকে বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টন

মোট মাছের উৎপাদন
১৯৯০ সাল ১,৯৩,০০০ টন
২০০০ সাল ৬,৫৭,০০০ টন
২০১৪ সাল ১০,০০,০০০ টন

বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত মাছের জাত এবং তা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে মাছের উৎপাদন এতটা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা

বাংলাদেশে প্রাণিজ আমিষের ৫৭% মাছ থেকেই মেটে