কিশোরী সম্মেলনে শপথঃ আর নয় বাল্যবিয়ে

পঞ্চম শ্রেণীর রাশিদা খাতুনের বয়স ১৩ বছর। বড় বোনের বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে পাশের বাড়ির কলিম শেখ তাকে আটকে রাখে। হত্যার হুমকি দিয়ে একটি কাগজে সই করিয়ে নেয়। পরে রাশিদা জানতে পারে, লোকটির সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গেছে। মাসখানেক বন্দি থাকার পর স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশের সহায়তায় সে ছাড়া পায়। এখন রাশিদার স্বপ্ন বড় হয়ে আইনজীবী হবে। আর নয় বাল্যবিয়ে

রাশিদার মতো বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহস্রাধিক কিশোরীর অংশগ্রহণে গতকাল সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ‘বাংলাদেশ গার্ল সামিট ২০১৪’ (কিশোরী সম্মেলন)। সম্মেলনের মূল স্লোগান ছিল- ‘আর নয় বাল্যবিয়ে, এগিয়ে যাবো স্বপ্ন নিয়ে’। বাল্যবিয়ে বন্ধ ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ইউকেএইডের সহযোগিতায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক যৌথভাবে এ কিশোরী সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহস্রাধিক কিশোরী, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।
বিশেষ অতিথি ছিলেন যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লিন ফিদারস্টোন এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব তারিকুল ইসলাম। সম্মেলনে সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধি হিসেবে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যথাযথ ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সেলিমা আহমেদের পক্ষে সহসভাপতি হাসিনা নেওয়াজ এবং উইমেন পুলিশ নেটওয়ার্কের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্র্রাফিক) মিলি বিশ্বাস।
সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন ফজলে হাসান আবেদ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম পরিচালক শিপা হাফিজা ও সিনিয়র ডিরেক্টর আসিফ সালেহ।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে বাল্যবিয়ের হার ৬৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ এবং বিশ্বে চতুর্থ। প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিতেই কনের বয়স থাকে ১৮ বছরের নিচে। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন কিশোরীর বিয়ে হয় ১৫ বছরের নিচে। দরিদ্র পরিবারে ৮০ শতাংশ এবং ধনী পরিবারে ৫৩ শতাংশ বাল্যবিয়ে হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের নিচে। বিশ্বে প্রায় ১৮ কোটি মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে এবং ৫ কোটি মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। বিশ্বব্যাপী বছরওয়ারি বাল্যবিয়ের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ।
অনুষ্ঠানে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, অপরিণত বয়সে একটা শিশুর বিয়ে দেওয়া মানে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। তিনি বলেন, বাল্যবিয়েকে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে তা মোকাবেলায় বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ের হার এক-তৃতীয়াংশ কমাতে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিয়ে একবারেই বন্ধ করতে কাজ করছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। কিশোরীরা যেন আবেগের বশে অল্পপরিচিত কারও হাত ধরে ঘর ছেড়ে বের হয়ে নিজেদের বিপদগ্রস্ত না করে সেজন্যও অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী লিন ফেদারস্টোন বলেন, বাল্যবিয়ে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ব্রিটিশ সরকার জোরপূর্বক বিয়েকে অপরাধমূলক কার্যক্রম আখ্যায়িত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, বাল্যবিয়ের হারে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থানে। এ কারণে বাল্যবিয়ে রোধে বাংলাদেশ সরকারের অঙ্গীকার সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কথাকে কাজে পরিণত করতে হবে। এ জন্য ব্রিটিশ সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।
ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ফজলে হাসান আবেদ বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে নারীকে বোঝা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। তাদের মতামত নেওয়া হয় না বহু কিছুতেই। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলে অবশ্যই সমাজকে বাল্যবিয়ের অভিশাপমুক্ত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সম্মেলনের থিম সং ‘মোরা কিশোরী, মোরা নতুন দিগন্তের নিশানা’ গেয়ে শোনান কণ্ঠশিল্পী কনা ও ব্র্র্র্যাকের কর্মীরা। অনুষ্ঠানে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ‘তারুণ্যের আওয়াজ’ শীর্ষক চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে তৈরি করা তথ্যচিত্র প্রদর্শন এবং নাটিকা মঞ্চস্থ হয়। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের বাইরের চত্বরে মেলার আয়োজন করা হয়।