ব্রির গৌরবময় ৪৪ বছর

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই খাদ্য আর বাংলাদেশে ৯০ ভাগ লোকের প্রধান খাদ্য ভাত। কোনো দেশের শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে। দেশের জনসংখ্যা যখন ১৬ কোটি তখন এত মানুষের খাবারের জোগান দেওয়া সহজ কথা নয়। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই বিশাল চ্যালেঞ্জই গত ৪৪ বছর ধরে মোকাবেলা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত উদ্ভাবন করেছে চারটি হাইব্রিড জাতসহ মোট ৬৭টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত। বিগত চার দশকে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। ১৯৭০-১৯৭১ সালে এ দেশে চালের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টন। ৪০ বছরের ব্যবধানে আজ ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে দেশে যখন জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়েছে তখন চাল উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৩ কোটি টনের বেশি। আগে যে জমিতে হেক্টরপ্রতি ২-৩ টন ফলন হতো এখন হচ্ছে ৬-৮ টন। এসব সম্ভব হয়েছে ব্রির বিজ্ঞানীদের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা আর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
ব্রি উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে বোরো মৌসুমে সর্বাধিক ফলন ও কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয় ব্রি২৮ এবং ব্রি২৯ ধান। আমন মৌসুমে অনুরূপ সফলতার নজির সৃষ্টি করেছে বিআর১১ জাতটি। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় ব্রি উন্নত ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তির যথাযথ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। শৈত্য, খরা, জলমগ্নতা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন এবং দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকার জনপ্রিয় ধানের জাতে এসব বৈশিষ্ট্যের সংযোজন করছে ব্রি। স্বল্প জীবনকালের রোপা আমন ধানের জাত ব্রি ধান৩৩ উদ্ভাবন করা হয় ১৯৯৭ সালে। দেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুরে আমন মৌসুমে এ ধানের চাষাবাদ মরা কার্তিকে মঙ্গাজনিত মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রির গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল অল্প জমি থেকে বেশি পরিমাণ ধান উৎপাদন করা। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোই ছিল তখনকার মূল লক্ষ্য। এখন দেশের মানুষের চাহিদার ভিত্তিতে গুণে ও মানে উন্নত ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন চালের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ থেকে ১ লাখ টন চাল বিদেশে রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধান গবেষণায় যুগান্তকারী সাফল্যের ফলে ব্রিকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জনগণ একটি অন্নদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দান করেছে। বিশ্বে সর্বপ্রথম ব্রির বিজ্ঞানীরাই জিংকসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবন করেছেন। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিআর১৬, নারী ও শিশুদের রাতকানা প্রতিরোধে কার্যকর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ধান, রক্তশূন্যতা ও ডায়রিয়া রোগীদের জন্য উপকারী প্রায় ২০-২৪ পিপিএম জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪ অবমুক্ত করার ফলে ব্রি অন্নদাতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পুষ্টিদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করছে।
ধান গবেষণায় ব্রির সাফল্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের আবাদ দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছু দেশ যেমন, ভারত, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, চীন, কেনিয়া, ইরাক, ঘানা, গাম্বিয়া, বুরুন্ডি ও সিয়েরালিওনসহ অনেক দেশে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ব্যবহার করছে। পৃথিবীর ১৪টি দেশে বর্তমানে ১৯ জাতের ব্রি ধানের আবাদ হচ্ছে। বিজ্ঞান ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রি তিনবার স্বাধীনতা দিবস স্বর্ণপদক ও তিনবার রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক, পরিবেশ পদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১৬টি পুরস্কার লাভ করে।
ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর