বাংলাদেশের এলইডি বিপ্লব: রপ্তানি ছাড়িয়ে গেছে ৩২ মিলিয়ন ডলার

রপ্তানি ছাড়িয়ে গেছে ৩২ মিলিয়ন ডলার

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) মহাপরিচালক পাসকেল ল্যামি গত বছর চট্টগ্রাম ইপিজেডে এসে দেখে গেছেন অপ-সিড কম্পানি (বিডি) লিমিটেড। এরপর সদর দপ্তর জেনেভায় ফিরে ৬ ফেব্রুয়ারি অপ-সিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নোবুহিরো ওয়াকোকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লেখেন, গার্মেন্টের বাইরে এই মানের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প-কারখানা যে বাংলাদেশে থাকতে পারে, এ তাঁর ধারণাতেও ছিল না। অপ-সিড তাঁর ভুল ভেঙে দিয়েছে।

গত বছরের ১৩ জুন কারখানাটিতে এসেছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা। প্রতিষ্ঠানের মন্তব্য বইয়ে তিনি লিখে গেছেন, সর্বোচ্চ প্রযুক্তি এবং অপারেটরদের দক্ষতা দেখে তিনি বিস্মিত। তাঁর আশা, অচিরেই অপ-সিডের পণ্য ইউরোপে রপ্তানি হবে।

এ প্রসঙ্গে অপ-সিডের পরিচালক মো. আতাউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, উইলিয়াম হানা বাংলাদেশকে শুধু গার্মেন্টনির্ভর না হয়ে ভবিষ্যতের স্বার্থে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভরকারখানা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।

নিজেদের কাজ দিয়ে এভাবেই বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা ভেঙেছেন অপ-সিডের অপারেটররা। জাপানের মতো খুঁতখুঁতে দেশে সুনামের সঙ্গে ১৬ বছর ধরে এলইডি (লাইট-ইমিটিং ডায়োড) সামগ্রী সরবরাহ করছে কম্পানিটি। আর এ সাফল্যগাথার নেপথ্যে হাজারখানেক বাংলাদেশি শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রম।

শুরু থেকেই বাংলাদেশি অপারেটরদের ওপর আস্থা রেখেছিল অপ-সিড কর্তৃপক্ষ। এ কারণে বাংলাদেশে এমন একটি কারখানা গড়ার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধা ছিল না তাদের। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডের (সিইপিজডে) ৭ নম্বর সেক্টরে আটটি প্লট নিয়ে যাত্রা শুরু করে জাপানের তামুরা করপোরেশনের (Tamura Corporation) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অপ-সিড কো. (বিডি) লিমিটেড। পরের বছর শুরু হয় উৎপাদন। শুরুতেই মোবাইল ফোনের ব্যাক লাইট, এলইডি ব্যাক লাইট উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে সাত আইটেমের প্রায় ৯০ মডেলের এলইডি পণ্য তৈরি করে অপ-সিড। এর মধ্যে জাপানে ব্যবহৃত প্রায় ১৫ লাখ ভেন্ডিং মেশিনের ৮০ শতাংশ পুশ বাটন তৈরি হয় অপ-সিডে। বাংলাদেশ ছাড়াও তামুরা করপোরেশনের কারখানা আছে থাইল্যান্ড, জাপান, চীন, মিয়ানমার, ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একমাত্র জাপানি এলইডি কারখানা অপ-সিড।

এখানে উৎপাদিত পণ্য মূলত জাপানে রপ্তানি হয়। এলইডি পণ্যের জন্য জাপানে শার্প ও প্যানাসনিকের পরই অপ-সিডের অবস্থান। এ ছাড়া কিছু এলইডি যায় আমেরিকায়। ২০১৩ সালে অপ-সিড থেকে প্রায় ৩২ মিলিয়ন ডলার বা আড়াই শ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আর এ বছরের আগস্টের মধ্যেই রপ্তানির পরিমাণ ১৮৭ কোটি টাকা (২৪ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। কারখানাটিতে এ পর্যন্ত সাড়ে ২৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রতিবছর অপ-সিড প্রায় পাঁচ লাখ এলইডি বাল্ব রপ্তানি করে। কারখানার পরিবেশে মুগ্ধ সনি করপোরেশন ২০১০ সালে অপ-সিডকে সনি গ্রিন পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

নিজেদের উৎপাদিত বাল্ব সম্পর্কে কারখানার পরিচালক আতাউল হক বলেন, বাংলাদেশে মূলত সিএফএল (কম্প্যাক্ট ফ্লুরেসেন্ট লাইট) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সিএফএল চলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ঘণ্টা। অথচ অপ-সিড এলইডি লাইটের গ্যারান্টিই দেওয়া হয় ৪০ হাজার ঘণ্টা। প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে ব্যবহার করলে তাদের লাইট চলবে ১০ বছরের বেশি। এ ছাড়া ৬০ ওয়াট ক্ষমতার একটি সিএফএলে বিদ্যুৎ খরচ হয় ১৫ থেকে ১৯ ওয়াট। আর একই ক্ষমতার অপ-সিডের এলইডি লাইটে বিদ্যুৎ খরচ হবে ছয় থেকে সাত ওয়াট। তবে এলইডি লাইটের দাম কিছুটা বেশি হলেও (প্রায় এক হাজার ৫০০ টাকা) স্থায়িত্ব এবং কম বিদ্যুৎ খরচের কারণে অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

অপ-সিডের এলইডি বাল্ব চট্টগ্রামের চারতারা হোটেল দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের আগ্রাবাদ কার্যালয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। পেনিনসুলায় শুরুতে চীনের তৈরি এলইডি লাইট ব্যবহার করা হলেও অল্প দিনের মধ্যে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তারা অপ-সিডের বাল্ব নেয়। গত ছয় বছরে কোনো অভিযোগ আসেনি পেনিনসুলা থেকে।

চাইলে যেকোনো প্রতিষ্ঠান অপ-সিডের এলইডি পণ্য কিনতে পারে। এ জন্য আগে আবেদন করতে হবে। এরপর বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া (এলসি খোলা) অনুসরণ করে সিইপিজেডে অবস্থিত অপ-সিডের কারখানা থেকেই পণ্য কেনা যাবে।

ইপিজেড থেকে দেশের ভেতরে পণ্য বিক্রি কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে আতাউল হক বলেন, ‘যেকোনো প্রতিষ্ঠান বেপজা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বার্ষিক উৎপাদনের ১০ শতাংশ দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারে। আমরা বেপজার কাছ থেকে সেই অনুমোদন নিয়ে রেখেছি।’

এ মুহূর্তে অপ-সিডে এক হাজার ৮২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। তাঁদের মধ্যে মাত্র পাঁচজন বিদেশি। কর্মরতদের ৭০ শতাংশই নারী। ৩০০ জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের ভাড়া নেওয়া হোস্টেলে আবাসনের ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া ইপিজেডের পাশেই প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে ৭৫০ জনের আবাসনব্যবস্থার কাজ চলছে। আটতলার এ ভবন তৈরির জন্য কম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত দিনে বেতন, নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য রয়েছে দুপুরের খাবার এবং যাতায়াতের জন্য নিজস্ব বাস। আর শ্রমিকের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারও রয়েছে এ কারখানায়।

ভবিষ্যতে ব্যবসা আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠানটির। কারখানার নতুন ভবনে ক্যানন ব্র্যান্ডের ফটোকপিয়ার এবং এপসন ব্র্যান্ডের প্রিন্টারের আইডেন্টিফাই সেন্সর, সিরামিক ট্রান্সফরমার তৈরি করা হচ্ছে
অপ-সিডের একেবারে শুরু থেকেই আছেন মর্জিনা বেগম। সাধারণ স্টাফ থেকে তিনি এখন ব্যবস্থাপক (আমদানি ও রপ্তানি)। তিনি বলেন, ‘চাকরির বিজ্ঞাপনেই জাপানে প্রশিক্ষণেরকথা লেখা ছিল। মূলত সে আকর্ষণেই আবেদন করেছিলাম। সৌভাগ্যবশত সুযোগ পেয়ে ছয় মাস জাপানে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখানে যোগদান করেছি।’ দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা প্রসঙ্গে মর্জিনা বলেন, ‘এখানে কাজের ব্যাপারে আমার অভিভাবকরাও স্বস্তিবোধ করেন। কাজের পরিবেশ, কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতাসব কিছু মিলিয়ে অপ-সিড ছাড়ার চিন্তা মাথাতেও আসে না। বেতনও শুরুর তুলনায় ১৫ গুণ বেড়েছে।’