রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হবে ২০২২ সালে : আসছে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে আগামী ২০১৭ সালে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য নতুন করে আরো জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। সম্প্রতি প্রকল্পটির কাজ ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার দুজনকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিটটি নির্ধারিত ২০২২ সালেই উৎপাদনে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। এদিকে, রূপপুর প্রকল্পটিতে প্রত্যাশিত সফলতা এলে সরকার দেশে এ ধরণের আরেকটি প্রকল্প পরিকল্পনা হাতে নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটির প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রস্তুতিমূলক এসব কর্মকা-ের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তিনটি বিষয়ে জরিপ করতে চুক্তি করা হয়েছে রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। আরেকটি চুক্তি নভেম্বরে সম্পন্ন হবে। ২০১৬ সালের মধ্যে এসব জরিপের কাজ শেষ হবে। এরপর জরিপের এ প্রতিবেদনগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা তৈরি করা হবে। নকশা তৈরি করবে রাশিয়ার সরকারি সংস্থা অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। ২০১৭ সালে শুরু হবে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। এরপর ২০২২ সালে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রর প্রথম ইউনিটটি উৎপাদনে যাবে। অন্য ইউনিটটিও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা শুরু করবে ২০২৩ সালে।
প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল রাশিয়া সফরে যায়। সেখানে আমাকে এবং রোসাটমের প্রধান সের্গেই কিরিয়েনকোকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আমি ও কিরিয়েনকো ছাড়া দুদেশের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিরাই আছেন। এখন থেকে এই কমিটি রূপপুর প্রকল্পের কাজ সবসময় পর্যবেক্ষণ করবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধান করবে দ্রুতগতিতে। এতে প্রকল্পের কাজে অনেক গতি আসবে, বলেন তিনি।
ইয়াফেস ওসমান জানান, বাংলাদেশের রূপপুর প্রকল্পের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে তুরস্কে রাশিয়ানরা আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করে। কিন্তু একই সময়ে কাজ শুরু করলেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক বেশি। এ কারণে বাংলাদেশের ওপর রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছে যে, যথাসময়েই এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। নির্ধারিত সময়েই এ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে সক্ষম হবে।
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন জরিপের প্রয়োজন হয়। এখন পর্যন্ত ফিজিবিলিটি ইভ্যালুয়েশন (বাস্তব মূল্যায়ন), এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসম্যান্ট বা ইআইএ (পরিবেশগত
প্রভাব নিরূপণ) এবং সেফটি এন্ড হাইজিন রিপোর্ট (নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন) বিষয়ে তিনটি চুক্তি করা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। প্রায়োরিটি কনস্ট্রাকশনের জন্য চুক্তিটি সম্পন্ন হবে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে।
তিনি জানান, প্রকল্পটির প্রাথমিক এ প্রস্তুতি পর্যায়ের কাজের জন্য ৫৫৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ১০ শতাংশ বা ৫৫ মিলিয়ন ডলার। বাকি ৯০ ভাগ বা ৫০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ ঋণ দেবে রাশিয়া।
তিনি আরো জানান, যেসব চুক্তি করা হচ্ছে সেগুলো এই প্রকল্পের জন্য প্রস্তুতিমূলক পর্যায় ধরা হয়েছে। এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় এসব জরিপের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে তার ওপর ভিত্তি করে নকশা তৈরি হবে।
এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর প্রকল্পের জন্য আগের অধিগ্রহণকৃত ২৬২ একর জমির সঙ্গে নতুন করে আরো কিছু জমি অধিগ্রহণ করছে সরকার। পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা ‘রূপচর কণিকা’ নামে নতুন একটি চর অধিগ্রহণ করবে ভূমি মন্ত্রণালয়। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নতুন এ জমি দেখতে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনে যান।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাব থাকছে না। এ প্রকল্পের জন্যও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে। এ ধরনের কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আমরা প্রতিনিয়ত রাশিয়ায় লোক পাঠাচ্ছি, যাতে তারা প্রশিক্ষিত হতে পারে।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) ২০ জন সরাসরি রাশিয়ার বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গিয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। শিগগিরই আরো ১০ জনকে পাঠানো হচ্ছে। তবে খরচ কমাতে সরকার ভারতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা ভাবছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকের মধ্যে নানা শঙ্কা রয়েছে। কিন্তু রাশিয়া থেকে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা সংবলিত সর্বাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি দিয়ে সরকার রূপপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে। সুতরাং এসব শঙ্কা অমূলক।
যুগ্ম-সচিব রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীও বলেন, বাংলাদেশের যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হচ্ছে সেখানকার ১০০ বছরের ভূমিকম্পের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখেছে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, এখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নেই। আর যেভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ডিজাইন পরিকল্পনা করা হচ্ছে তাতে ৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পও এর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পানির প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব প্রভৃতি সবদিক বিবেচনা করেই এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তাই এ নিয়ে আশঙ্কা করার কিছু নেই।
অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে প্রাথমিক চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথাও বলছেন। ফরিদপুর বা খুলনা অঞ্চলে এই প্রকল্পটি করা হতে পারে। এ ব্যাপারে চীন আগ্রহ প্রকাশ করছে। তবে বিদ্যমান প্রকল্পটির সফলতার ওপর নির্ভর করছে এর ভবিষ্যৎ।
প্রসঙ্গত, ১৯৬২ সালে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগ নেয়ার প্রায় ৫০ বছর পর গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে পাবনার রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১০ সালে সংসদে প্রস্তাব পাস করা হয়। গঠন করা হয় একটি জাতীয় কমিটি। ওই বছরই রাশিয়ার সঙ্গে একটি কাঠামো চুক্তি করে সরকার। ২০১১ সালের নভেম্বরে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি সংস্থা রোসাটমের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুয়ায়ী, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে রুশ সরকার। এছাড়া কেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং ব্যবহৃত জ্বালানিও ফেরত নেবে তারা। প্রকল্পের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রাশিয়ান সরকার সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে দেবে ৯ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১ বিলিয়ন ডলারের জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার।

Views: 14