বিনিয়োগ বেড়েছে ৮০ শতাংশ

সরকারের নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা ৮০ শতাংশ বেড়েছে। আর গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার ছিল ৩৭ শতাংশ। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। সরকার আগামী বছরের মধ্যে দেশে ৫০০ কোটি ডলার সরাসরি বিনিয়োগ আশা করছে বলে বিনিয়োগ বোর্ডসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়াতে ১৭ খাতে কর অবকাশ সুবিধাও দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) সূত্রে জানা গেছে, আগের মেয়াদেই (২০০৯-১৩) সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বাড়তি জোর দিয়েছিল সরকার। বিদেশি বিনিয়োগের গতি বাড়াতে বিনিয়োগ বোর্ড ১৭ খাতে কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে, যা ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। নিজ দেশে মুনাফার অর্থ নেয়ার ক্ষেত্রেও বিধিবিধান আগের তুলনায় অনেক শিথিল করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থ, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন ও বিনিয়োগ বোর্ড একীভূত করতে আইন করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ আবদুস সামাদ বর্তমানকে বলেন, ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে এফডিআই ৫ থেকে ৬শ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, চলতি বছর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে। জানা গেছে, বর্তমানে ৩২ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বি-পাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি রয়েছে। আরও আটটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। একইভাবে ২৮ দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ২১ দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের কাজ চলছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান ও চীন সফর করেছেন। এ সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিধর এ দেশ দুটি এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। চীন এবং জাপান এখন বাংলাদেশের বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বাংলাদেশ সফরকালে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। অনদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব দেশ সফর করছেন, সেসব দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। জানা গেছে, সরকারের উদার বিনিয়োগ নীতি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পদক্ষেপ ও সস্তা শ্রমিকের সহজলভ্যতা, সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতউল্লাহ আল মামুন বলেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে সরকার। তিনি বলেন, চীন, জাপানসহ শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর বড় বড় উত্পাদক যেমন মিত্সুবিসি, টয়োটা, হুন্দাই— এই মাপের কোম্পানিগুলোর সাপ্লাই চেইনে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে এসব দেশের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বাণিজ্য সচিব বলেন, সরকার রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বাড়তি জোর দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার শিল্প ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগকে উত্সাহিত করছে। সরকারের উন্মুক্ত বিনিয়োগ নীতির ফলে এফডিআই এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) যৌথ বিনিয়োগ বাড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ১৭ খাতে কর অবকাশ সুবিধাও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া উত্পাদনমুখী শিল্পের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পনেরোটি সেবামূলক খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। খাতগুলো হচ্ছে— নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেমন— হাসপাতাল, ক্লিনিক ও নার্সিং, হোটেল ও পর্যটন, কনসাল্টিং সার্ভিসেস, ল্যাবরেটরি টেস্টিং, ফটোগ্রাফি কার্যক্রম, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, টেলিকমিউনিকেশন, পরিবহন ও যোগাযোগ, ওয়্যারহাউস ও কন্টেইনার সার্ভিস, ব্যাংকিং কার্যক্রম, আইন ও পেশাগত সার্ভিস ও শিক্ষাসেবা।
সম্প্রতি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের প্রকাশিত বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনের তথ্যে জানা গেছে, গত বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এফডিআই প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত বছরে এফডিআইয়ের পরিমাণ রেকর্ড ১১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএফসি প্রকাশিত ‘ইজি অ্যান্ড ডুয়িং বিজনেস-২০১৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৮৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩০তম। সূত্র জানায়, গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট এবং জমির স্বল্পতা, অবকাঠামোগত সমস্যা থাকার পরও দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের গতি বেড়েছে। দেশে ২০০১ সাল পর্যন্ত এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার, যা গত ২০০৯-১৩ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৪২ মিলিয়ন ডলারে। আর বিনিয়োগ সুরক্ষায় বিশ্বে ২২তম স্থানে রয়েছে এখন বাংলাদেশ।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের কর্মকর্তাদের বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে টাস্কফোসের্র প্রধান করা হয়েছে। দেশে নয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বও দেয়া হয়েছে এ টাস্কফোর্সকে। ইতিমধ্যে সরকার পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের মিরেশ্বরাই ও আনোয়ারার গহিরা, সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সেতু সংলগ্ন এলাকা, বাগেরহাটের মংলা ও মৌলভীবাজারের শেরপুরে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের উত্পাদনমুখী খাতে বিশেষ করে টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগে সরকার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়ারও চিন্তাভাবনা করছে। এ ছাড়া আমদানিনির্ভরতা হ্রাসে সেবামূলক খাতগুলোর পাশাপাশি বৃহত্ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহিত করছে সরকার। টেক্সটাইল, চামড়াজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক দ্রব্য, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্পের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। ভারী শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকল্পে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা এবং নদী অববাহিকার পরিত্যক্ত জমি ব্যবহারের ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিল্প-কারখাানা নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জমি বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নিয়মানুযায়ী জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির মালিককে দেড়গুণ মূল্য দেয়ার বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ইতিবাচক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী, যা দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।