বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ

দেশের বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারের অংশ হিসেবে পুরোনো আইন পরিবর্তন করে নতুন বিদ্যুৎ আইন তৈরি করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) কর্পোরেশন বা হোল্ডিং কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করার পাশাপশি নতুন আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া কারিগরি বিষয়গুলো দেখ-ভাল করতে গঠন করা হচ্ছে অপারেশন এন্ড মেনটেইনেন্স কোম্পানি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে বৃহৎ আকারে এ ধরনের সংস্কার করা হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সার্বিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সংস্কার চান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সে লক্ষ্যে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ২০০৮ সালের জুলাইয়ে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এডিবি বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারে কর্পোরাইজেশন অব বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড নামে একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দাখিল করে। প্রতিবেদনে সংস্কারের বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এই কর্মকর্তা জানান। এছাড়া চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়ে যান। বর্তমানে সে অনুযায়ীই বহুমুখী সংস্কারের এই কাজ চলছে।

তিনি জানান, এ বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছাড়াও পিডিবি, পিডিবির নীতি নির্ধারণী সংস্থা পাওয়ার সেলসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

তবে তিনি বলেন, কিছু কিছু সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সিবিএ নেতারা ভেতরে ভেতরে বিরোধিতার পাঁয়তারা করছেন। কারণ নতুন বিদ্যুৎ আইনে যে ধরনের সংস্কার করা হবে তাতে কিছু কিছু জায়গায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়টি জানতে পেরে সিবিএ নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। তবে এতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট থাকায় তারা প্রকাশ্যে উচ্চবাচ্য করতে পারছেন না। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তাও রয়েছেন যারা বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করার চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকর্তা সিবিএ নেতাদের কাছে নানা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন বলে মন্তব্য করেন তিনি ।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতকে শুধু সেবাখাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে এটা স্বাভাবিক হলেও এখন এ খাতে সেবার মান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

ফলে এ খাতের বাণিজ্যিকীকরণ করারও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই এই সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ব্রিটিশ আমলের বিদ্যুৎ আইন প্রচলিত রয়েছে। সরকার মনে করছে, এর সংস্কার প্রয়োজন। সরকার এ বিষয়টি মাথায় রেখেই নতুন বিদ্যুৎ আইন করতে যাচ্ছে। তবে ২০১৫ সালের আগে আইনটি প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না।

সূত্র আরো জানায়, নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করা যাবে না- খসড়ায় এমন কথা উল্লেখ করা রয়েছে। এছাড়া এ আইনের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত বিধিমালাও জারি করা হতে পারে বলে সূত্র জানায়।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই এ নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা ডাকা হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়নের ব্যাপারে দুই ধরনের মতই রয়েছে। এক পক্ষ চায় ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান রাখা উচিত। অন্যপক্ষ এর বিরোধিতা করে আসছে। তবে আমরা এখনই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এদিকে পিডিবির একটি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে পিডিবিকে কর্পোরেশন বা হোল্ডিং কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হতে পারে। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, লোকসান কমাতে পিডিবির এ রূপান্তর জরুরি।

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যমান পাঁচটি বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরো নতুন তিনটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে যা ঢাকা বিভাগে (ঢাকা মহানগর এলাকার বাইরে) সেবা প্রদান করবে। এর নামকরণ করা হবে সেন্ট্রাল জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এছাড়া ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আদলে নর্থ জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং সাউথ জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নামে আরো দুটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে।

সংস্কারের ধারাবাহিকতায় ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশকে (ইজিসিবি) শক্তিশালী করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে হরিপুর এবং সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো ইজিসিবির অধীনে এনে একে কর্পোরেশন করা হবে। একইভাবে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রকেও কর্পোরাইজেশন করা হবে। এছাড়া অপারেশন এন্ড মেনটেইনেন্স কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হবে যা বিভিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এবং বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন কারিগরি দিক দেখভাল করবে। সরকার মনে করছে, এতে দেশে দক্ষ জনবল তৈরি হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, সরকার বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে নানাধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কারের পথে যেসব বাধা রয়েছে তা আলোচনা-পর্যালোচনা করে দূর করা হবে। তবে এ সংস্কার সম্পন্ন হলে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।