জৈব প্রযুক্তিতে ফসল উৎপাদনে নজর কেড়েছেন রণজিৎ মন্ডল

জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মৌসুমভিত্তিক দ্বিগুণ সবজি উৎপাদন করে এলাকায় সুনাম কেড়েছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার শংকরকাটি গ্রামের কৃষক রণজিৎ মন্ডল (৪৫)। রাসায়নিক সার কীটনাশকের যুগে জৈব পদ্ধতি ব্যবহারে প্রমাণ করলেন কীভাবে মাটির স্বাস্থ্য ভালো রেখে ফসল উৎপাদন করা যায়। তার এ প্রযুক্তি দেখে এলাকার অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন শুরু করেছেন।

শ্যামনগর সদর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে কাশিমাড়ি ইউনিয়নের শংকরকাটি গ্রাম। এ গ্রামের প্রায় শেষ প্রান্তে বসবাস করেন মৃত সুবোধ চন্দ্র মন্ডলের ছেলে রণজিৎ মন্ডল। নিজের মোট ৬ বিঘা জমির মধ্যে ৩ বিঘায় জৈব সার অর্থাৎ কেঁচো কম্পোস্ট ও কুইক কম্পোস্ট ব্যবহার করে মনোমুগ্ধকর সবজি উৎপাদন করেছেন। তার উৎপাদিত সবজির মধ্যে রয়েছে বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, শসা, মেনকা, ঝিঙে, চালকুমড়া, লালশাক, পালংশাক, বরবটিসহ মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন সবজি। এসব উৎপাদিত শাকসবজি তৈরিতে তার বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেও দেড় লাখ টাকার মতো লাভ থাকে। সবজি বিক্রির জন্য তাকে বাজারে যেতে হয় না। সবজি ক্রেতারা পাইকারি হিসেবে তার বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান। রণজিৎ মন্ডল জানান, উৎপাদিত সবজি গ্রাম ছাড়া বাইরের বাজারে বিক্রি করতে পারলে আরো বেশি দাম পাওয়া যেত। পিতা সুবোধ চন্দ্র মন্ডলও এ পেশায় জড়িত ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে রণজিতের অষ্টম শ্রেণির বেশি লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। স্ত্রী দীপালি মন্ডল তার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ে তাদের। সবজি উৎপাদনের পরিশ্রমের লভ্যাংশ দিয়ে মেয়েকে ভালোভাবে বিয়ে দিয়েছেন। গত বছর এক বিঘা এবং এ বছর এক বিঘা ধানের জমি কিনেছেন। প্রায় প্রতিদিন তিন-চার জন শ্রমিক মাঠে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি ও তার স্ত্রী-পুত্র কাজ করেন। বাড়িতে সৌরশক্তি কিনেছেন, মাসে মাসে মোটামুটি সঞ্চয় করছেন এবং ছেলেদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন।
রণজিৎ মন্ডল বলেন, জৈব প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ফসল ও মাটির গুণগতমান বজায় থাকে এবং সবজি খেতে সুস্বাদু। জৈব প্রযুক্তির মধ্যে কেঁচো কম্পোস্টের বিষয়ে বলেন, তার বাড়িতে চারটি রিংয়ের মাধমে প্রতি মাসে এক কেজি কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে। এর থেকে কিছু বিক্রিও করছেন এবং বাকিটা নিজের ক্ষেতে ব্যবহার করছেন। এটি তৈরিতে গোবর ও কেঁচো লাগে। তিনি এক বিঘা জমিতে দুই মণ কেঁচো কম্পোস্ট ব্যবহার করেন। এটি তৈরিতে সুবিধা হলো অপতিত জায়গায় চাষ করা যায়। তার তৈরি এ কম্পোস্ট সার বাগেরহাটসহ স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তি কেনে। গত বছর সাত হাজার টাকার কেঁচো কম্পোস্ট সার বিক্রি করেছেন। জানা যায়, প্রতি কেজির দাম ১৩০০-১৪০০ টাকা। রণজিৎ মন্ডলের কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাশাপাশি কৃষক পবিত্র মন্ডল, নিশিত মন্ডল, মনোরঞ্জন মন্ডল, দেবব্রত মন্ডলসহ অন্যরা এ কম্পোস্ট সার ব্যবহারসহ বাড়িতে চাষ শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন, বাড়িতে গরু থাকলে ভালো হয়। এদিকে উপজেলায় লবণপানিতে চিংড়ি চাষের কারণে গোখাদ্যের সঙ্কট রয়েছে। কুইক কম্পোস্ট তৈরির বিষয়ে বলেন, কাঠের গুঁড়া ২০ কেজি, গোবর ৪০ কেজি, খৈল ১০ কেজি একসঙ্গে মিশিয়ে পলিথিনে প্যাকেট করে রাখেন। আবার ১০-১২ দিন পর ওলট-পালট করে দেন। যদি গন্ধ থাকে তাহলে আবার বেঁধে রাখেন। এভাবে সার তৈরি করেন। তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে ১২০ কেজি কুইক কম্পোস্ট সার ব্যবহার করলে ভালো হয়। কুইক কম্পোস্টের ব্যবহার দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি তৈরি করেছেন একই গ্রামের কৃষক নিরঞ্জন মন্ডল, পরাগ মন্ডল, পবিত্র মন্ডল, মনোরঞ্জন মন্ডল ও অন্যরা। কেঁচো কম্পোস্ট ও কুইক কম্পোস্ট তৈরির জ্ঞান তার আগে ছিল না। তিনি শ্যামনগরে কর্মরত বেসরকারি সংগঠন নকশীকাঁথা ও ঢাকার ভিএসও বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০১২ সালে হাতে কলমে এ সংগঠনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তার পর থেকে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন এবং সফল হয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ, সাবানপানির ব্যবহার, নিমপাতা, মেহগনির বীজ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। এসব জৈব সার ব্যবহারের গুণাবলি উল্লেখ করে বলেন, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে, উৎপাদিত ফসল রান্নার পর খেতে সুস্বাদু লাগে। সবজি গাছ বলবান হয়। এ পদ্ধতিতে খরচ কম। জৈব সার ব্যবহারে পোকামাকড় কম লাগে।

রণজিৎ বর্মণ, নকশীকাঁথা,
শ্যামনগর, সাতক্ষীরা