শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ইউনেস্কোর সম্মাননা

শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘শান্তি বৃক্ষ স্মারক’ সম্মাননা দিয়েছে ইউনেস্কো।

রাজধানীর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বকোভা প্রধানমন্ত্রীর হাতে সম্মাননা তুলে দেন।

এর আগে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার সকালে ‘টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি : নারী শিক্ষা ও সাক্ষরতা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউনেস্কো পুরস্কার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী শিক্ষার প্রসার এবং নারী শিক্ষা প্রসারে অসামান্য অবদানের জন্য এবার দুটি ক্যাটাগরিতে ৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন: বুর্কিনা ফাসো’র অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রমোশন অব নন-ফরমাল এডুকেশন এর প্রেসিডেন্ট আনাতোলে টি. নিয়ামেওগো (Anatole T. Niameogo), ইকুয়েডরের শিক্ষামন্ত্রী আগুস্তো এসপিনোসা,(Augusto Espinosa), আলজেরিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যালফাবেটাইজেশন’র প্রেসিডেন্ট আয়েশা বার্কি (Aicha Barki), স্পেনের পারমানেন্ট এডুকেশন সেন্টার পলিগনো সার সেবিলি’র পরিচালক আনা গার্থিয়া রেইনা (Ana Garcia Rein), এ প্রতিষ্ঠানের উপ-পরিচালক ইসাবেল দিয়েলবার্ত (Isabel Dealbert), দক্ষিণ আফ্রিকার মল্টটেনো ইনস্টিটিউট ফর ল্যাগুয়েজ অ্যান্ড লিটারেসি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লিটারেসি ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসেন্নিয়া দিকোতলা (Masennya Dikotla), এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড্যান এ. ওয়াগনার (Dan A. Wagner)।প্রধানমন্ত্রী পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সনদ, স্মারক ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা।

ইউনেস্কো সাক্ষরতা পুরস্কারে অংশ নেওয়ার জন্য এবার ঢাকায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২৭ দেশের প্রতিনিধি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) ৬০ জন বিদেশী শিক্ষানুরাগী এসেছেন। যাদের মধ্যে ইকুয়েডর, শ্রীলংকা, ভুটানের শিক্ষামন্ত্রী, আফগানিস্তানের উপ-শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখযোগ্য।

ইউনেস্কো সাক্ষরতা পুরস্কার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি জেলায় একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তুললে তারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে। এ জন্য জাতিসংঘসহ বন্ধু রাষ্ট্রদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

পুরষ্কারপ্রাপ্তীর পর ইউনেস্কোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শান্তিবৃক্ষ স্মারকটি সমগ্র বিশ্বের নারীদের উৎসর্গ করে বলেন, এই স্বীকৃতি আমি বাংলাদেশের মা-বোনদের, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের উৎসর্গ করছি। এর দাবিদার তারাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। উন্নত ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ গঠনে সরকার ইতিমধ্যে প্রত্যেক জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, নারীরা যেকোনো অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখাবে যদি তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া যায়।

শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের প্রতিটি শিশু, বিশেষ করে কন্যাশিশুকে শিক্ষাদান আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েরা স্কুলে যেতে বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হয়। তাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা এর অবসান চাই।

সাক্ষরতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো লিটারেসি অ্যাওয়ার্ড ২০১৪’ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, আলজেরিয়া, ইকুয়েডর ও বুর্কিনা ফাসোর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদেরও অভিনন্দন জানান তিনি।

শিক্ষা বিস্তারে ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নারীশিক্ষা ও সাক্ষরতাকে জাতিসংঘের আওতায় ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন প্রস্তাবে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছি। আমরা এ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

নারীশিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নানান প্রতিকূলতায় মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের প্রতিটি ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়।

নারীশিক্ষা প্রসারে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মেয়েদের জন্য প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছি। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। ফলে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত জেন্ডার-সমতা নিশ্চিত হয়েছে।

তিনি বলেন, স্নাতক পর্যায়ে নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা-সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছি। এই ফান্ডে সরকার এক হাজার কোটি টাকা সিড মানি প্রদান করেছে। ইতোমধ্যেই এই ফান্ড থেকে স্নাতক ও সমপর্যায়ের ১ লাখ ২৯ হাজার ৮১০ জন ছাত্রীকে প্রায় ৭৩ কোটি টাকার উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এতে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ছাত্রদের তালিকাও করা হয়েছে। আগামীতে ছাত্রদের উপবৃত্তি দেওয়া হবে।

ঝরেপড়া রোধে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মিড-ডে মিল চালু করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। নারী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মেয়েদের নতুন নতুন পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছি। সব পেশায়ই মেয়েদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আত্ম কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা সৃজনে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও যোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। মেয়েদের জন্য ৬টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য প্রযুক্তিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেব ব্যবহার করা হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে আইটি শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করেছি। ইউনিয়ন তথ্যসেবাকেন্দ্র চালু করেছি। এখান থেকে গ্রামের নারীরাও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা গ্রহণ করতে পারছে।

উচ্চ শিক্ষা প্রসারে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রসারে আমরা পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছি। আরও ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

মূলধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী এসময়।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, উপযুক্ত শিক্ষাই পারে একটি মেয়েকে সামাজিক,মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে। যে কোনো ধরনের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসও শিক্ষাই দিতে পারে। আমরা সে কাজটিই করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে জুনিয়র স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল ও উচ্চমাধ্যমিকসহ সকল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এখন ৯২ শতাংশ পাশ করছে। পরবর্তীতে কম করে হলেও ৯৮ ভাগ পাশ করবে এটাই আমাদের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের প্রতিটি শিশু বিশেষ করে কন্যাশিশুকে শিক্ষাদান আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েরা স্কুলে যেতে বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হয়। তাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা এর অবসান চাই। এটাই হোক আজকের এই সম্মেলনে আমাদের দৃপ্তশপথ।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি শিশু স্কুলে যেতে পারছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যখন ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসি তখন সাক্ষরতার হার ছিল ৪৫ শতাংশ। সেটাকে ২০০১ সালে আমরা ৬৫ ভাগে নিয়ে যাই। কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত সরকার সেই অর্জন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয। ২০০৬ সালে সাক্ষরতার হার ৪৪ শতাংশে নেমে আসে।

শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১১ সালের মধ্যেই বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করেছি। আমরা প্রতি বছরের প্রথম দিন প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করছি।

তিনি বলেন, রূপকল্প ২০৪১-এর ভিত্তিতে একটি উন্নত, সুশিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের সোপান রচনায় আমরা দৃঢ়প্রতজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞে নারী ও মেয়ে শিশুরা সব সময়ই আমাদের বিবেচনার অগ্রভাগে থাকবে।

এতে আরো বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচএম মাহমুদ আলী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।