১৪ বছর পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায়

সহযোগিতার নতুন দিগন্ত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক : দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সমন্বিত অংশীদারিত্বের পথে এগিয়ে যেতে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ বৈঠকে শনিবার এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষরিত যৌথ ইশতেহারেও এই আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। শীর্ষ বৈঠকে জাপানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করলে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি আরো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে। আর পরিবেশ সৃষ্টিতে সকল প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও দেবে জাপান। যেন দ্রুতই বাংলাদেশ বিগবির অংশ হিসেবে যোগ্য হয়ে ওঠে। এজন্য আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে প্রতিশ্রুত ৬০০ কোটি ডলার সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। যার ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। এর সবই ব্যয় হবে অবকাঠামো, কৃষি ও জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের জন্য। এর মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পর বাংলাদেশে ২১ খাতে বিনিয়োগের কথাও জানানো হয়েছে জাপানের পক্ষ থেকে।
শনিবার বেলা একটার কিছু আগে জাপানের প্রধানমন্ত্র্রী শিনজো আবে স্ত্রী আকিয়ে আবেসহ ১৬৮ জনের প্রতিনিধি দল নিয়ে বিশেষ বিমানে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা এসে পৌঁছান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমান থেকে নামার পর দুই শিশু আবে ও তার স্ত্রীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয়। দেয়া হয় লাল গালিচা সংবর্ধনা। পরে তিন বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেয়, বাজানো হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত। জাপান ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সামনে এসে জাপানি কায়দায় মাথা নুইয়ে দুই দেশের পতাকার প্রতি সম্মান জানান শিনজো আবে। পরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে থাকা মন্ত্রিসভার সদস্য ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে একে অপরকে পরিচয় করিয়ে দেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি যান সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। সেখানে ফুল দিয়ে একাত্তরের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শিনজো আবে। স্বাক্ষর করেন পরিদর্শন বইতে। পরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর যান সোনারগাঁও হোটেলে তার জন্য নির্ধারিত প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটে।
স্বল্প সময়ের বিশ্রাম শেষে যোগ দেন জাপান বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের বৈঠকে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অরগানাইজেশন (জেট্রো) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড ও শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) যৌথ আয়োজনের এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন মিতসুবিশি, নিপ্পন, তোসিবা, সুমিতোমা, টয়োটার মতো আরও বেশকিছু বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শীর্ষ ব্যক্তিরা। হোটেল থেকে বেরিয়ে চলে যান তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কার্যালয়ে বাইরে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে একান্তে প্রায় আধাঘণ্টা আলোচনা করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। একান্ত বৈঠক শেষে শুরু হয় ‘বাংলাদেশ ও জাপান’ শীর্ষ বৈঠক। শিনজো আবের নেতৃত্বে জাপানের প্রতিনিধি দলের বিপরীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টাসহ দশ সদস্যের প্রতিনিধি দল ছিল বৈঠকে। মূলত জাপানি জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে জাপানের বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা নিয়ে পর্যালোচনা হয় এই বৈঠকে। বৈঠকের পর স্বাক্ষর করেন যৌথ ইশতেহারে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হাতে উপহার হিসেবে দুটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবিযুক্ত অ্যালবাম তুলে দেন। এই বাঘ দুটি ঢাকা থেকে সরাসরি টোকিওতে পাঠানো হবে। পাশাপাশি শিনজো আবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের প্রতিকৃতি সংবলিত বিশেষ স্মারক মুদ্রা তুলে দেন শেখ হাসিনার হাতে। পরে তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। প্রথমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা, পরে শিনজো আবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাপানের পরবর্তী ব্যবসা ও বিনিয়োগের স্থান হিসেবে জাপান বাংলাদেশকে নির্ধারণ করবে বলে আমরা আশা করব। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের রিজার্ভ ও জিডিপি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মডেল হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে শিল্প কারখানা স্থাপনের ব্যয় অত্যন্ত কম। এছাড়া শিল্প স্থাপনের জন্য বাংলাদেশে সকল সুযোগ দেয়া হবে। নিশ্চিত করা হবে নিরাপত্তা। শুধু জাপানের সরকারি নয় বেসকারি বিনিয়োগকারীদেরও বাংলাদেশের চামড়া, বস্ত্র, আইটি, টেলিকমিউনিকেশনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাই। তাদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ আমরা এগিয়ে নিয়েছি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জাপানের সমর্থনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার এর ঘোষণার সময় করতালিতে অভিনন্দন জানানো শিনজো আবে তার বক্তব্যের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রব্ধার কথা জানান। ধন্যবাদ জানান প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য। বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। শুধু দ্বিপক্ষীয় নয় আন্তর্জাতিক সব ফোরামেও এই বন্ধুত্ব রক্ষা করবে দুই দেশ। তিনি বলেন, জাপান বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চায়। এজন্যই সমন্বিত অংশীদারিত্বের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত গ্রুপের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন খাতে সহায়তার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিলিয়ন ডলার সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ঘোষণা রয়েছে। এর মধ্যে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন সহায়তা হিসেবে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন শিনজো আবে। তিনি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেরিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী যান বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে। সেখানে আধাঘণ্টা অবস্থান শেষে হোটেলে ফিরলে অপেক্ষারত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেখা করেন শিনজো আবের সঙ্গে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি জোরদারে সহায়তা বজায় রাখার আশ্বাস দেয়া শিনজো আবে এর পর বৈঠক করেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে। রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত নৈশভোজে সস্ত্রীক অংশ নেন শিনজো আবে। হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এই নৈশভোজের মাধ্যমে শেষ হয় শনিবারের সরকারি কর্মসূচি। আজ সকালে শিনজো আবে যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে। পরে বিশেষ বিমানে ঢাকা ত্যাগ করবেন সকাল সাড়ে দশটায়; যাবেন শ্রীলঙ্কার কলম্বো।
প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে আবে: জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে শনিবার রাতে সোনারগাঁও হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে দেয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমন্বিত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও জাপান সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। শেখ হাসিনা বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছি। পারস্পরিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছি। নৈশভোজে শিনজো আবের সফরসঙ্গীরা ছাড়াও বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার সদস্য ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নৈশভোজের আগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠায় জাপান বিশ্বস্ত ও সক্রিয় অংশীদার হয়ে থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন।
জাপানি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী: বাংলাদেশের গাড়ি নির্মাণ শিল্পে বিনিয়োগ করার জন্য জাপানি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সফররত জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে এই আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য এক্সক্লুসিভ ইকনোমিক জোন তৈরির লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বাংলাদেশে টেক্সটাইল, চামড়া, পেট্রো-কেমিক্যাল, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, কৃষিনির্ভর শিল্প, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। তবে গাড়ি নির্মাণ শিল্প ও মাইক্রোপ্রসেসরের মত উচ্চপ্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বিশেষভাবে প্রত্যাশা করছি আমরা। আমরা অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদ্বারিত্ব নীতিও গ্রহণ করেছি। বৈঠকের সময় ব্যবসায়ী দলের সঙ্গে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে উপস্থিত ছিলেন।
(একে/এসএইচ/সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৪)