সাড়ে ৬ লাখ ব্যাংক হিসাব খুলেছে স্কুল শিক্ষার্থীরা

বিদ্যালয়গামী ছেলেমেয়েদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু হয়েছে সাড়ে তিন বছরের কিছু বেশি সময় হলো। এর মধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোতে ৪০৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা জমিয়েছে খুদে সঞ্চয়ীরা। গত জুন পর্যন্ত দেশের ৪৯টি ব্যাংকে খোলা ছয় লাখ ৩৯ হাজার ৪৬৫টি ব্যাংক হিসাবে এই পরিমাণ অর্থ জমা পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সম্প্রতি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা এবং তাতে অর্থ জমা করার প্রবণতা বেড়েছে। গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে দুই লাখ ৭৩ হাজার ২১১টি হিসাব খুলেছে শিক্ষার্থীরা। এই তিন মাসে জমা স্থিতি বেড়েছে ৪০ কোটি টাকা।
অথচ প্রথম দিকে দেড় লাখ স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে সময় লেগেছিল আড়াই বছর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের নভেম্বর থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৫টি ব্যাংকে মোট এক লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছে। ওই সময় হিসাবগুলোতে মোট স্থিতি ছিল ৯৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
জানা গেছে, ২০১০ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দেয়। এতে উল্লেখ করা হয়, সঞ্চয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাংকিংসেবার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের এর আওতায় আনা হলে দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে।
শুরুতে মাত্র ১০ টাকা জমা রেখে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা যেত। তবে চলতি বছর স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে, যাতে বলা হয়, কমপক্ষে ১০০ টাকা জমা করে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে হবে। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খুলতে পারবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে অভিভাবকরা এসব হিসাব পরিচালনা করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলায় শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ৩০ জুন হালনাগাদ হিসাবের ভিত্তিতে ব্যাংকটিতে খোলা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৯৭টি। এ ছাড়া রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৮২ হাজার ৫৪৩টি, অগ্রণী ব্যাংকে ৬২ হাজার ৪৫টি, ডাচ্-বাংলায় ৪৯ হাজার ৯৬৩টি এবং উত্তরা ব্যাংকে ৪৭ হাজার ৯৭৮টি হিসাব খোলা হয়েছে।
আর স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে ১৪৮ কোটি টাকা জমা স্থিতি হওয়ায় এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের ৪৮ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪২ কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৩ কোটি টাকা ও ফার্স্ট সিকিউরিটিতে খোলা স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে জমা রয়েছে ২২ কোটি টাকা। নতুন চালু হওয়া ব্যাংকগুলোও স্কুল ব্যাংকিংয়ে নজর দিচ্ছে। গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে নতুন চালু হওয়া মেঘনা, এনআরবি কমার্শিয়াল ও এনআরবি ব্যাংকে ২৮৯টি হিসাব খুলেছে শিক্ষার্থীরা। হিসাব খোলার বিষয়ে শহরের ছেলেমেয়েদের আগ্রহই বেশি এবং এসব হিসাবের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ফি প্রদানও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন শেষে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহর এলাকায় বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। মার্চ-জুন সময়ে তিন হাজার ৫০৯টি স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীদের ফি সংগ্রহ করা হয়েছে। এ সময়ে ২৪৮ কোটি টাকা জমা হয়েছে। উত্তোলন করা হয়েছে ১৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এটিএমের মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘আজকে যারা লেখাপড়া করছে আগামীতে তারাই দেশের হাল ধরবে। এদের যদি ছোটবেলা থেকে সঞ্চয়ের মধ্যে নিয়ে আসা যায়, মিতব্যয়িতা শেখানো যায়, তবে তারা বড় হয়ে দেশের জন্য সম্পদ হয়ে উঠবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও গ্রিন ব্যাংকিং অ্যান্ড সিএসআর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, ব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা যেন সব মানুষ ভোগ করতে পারে সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা। পথশিশুদের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর শিক্ষার্থীরা তো দেশের ভবিষ্যৎ। তারা যদি ছোটবেলাতেই ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে, হিসাব পরিচালনা করতে পারে, তাহলে তারা খুব সহজেই ব্যাংকিং সম্পর্কে জানতে পারবে।