‘নীল সমুদ্র অর্থনীতি’র বিশাল সম্ভাবনা

পৃথিবীর ক্ষমতাশালী দেশগুলো তাদের সমুদ্র অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে নানা ধরনের কৌশল নিচ্ছে। কারণ সমুদ্রই পৃথিবীর আমদানি-রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান নিয়ামক। এ ছাড়া মৎস্য ও সমুদ্রের অভ্যন্তরে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের কারণে সমুদ্র ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্লু ওসান ইকোনমি বা ‘নীল সমুদ্র অর্থনীতি’ বা সংক্ষেপে সমুদ্র অর্থনীতি। এ অর্থনীতি একটি দেশকে পাল্টে দিতে পারে, বদলে দিতে পারে দেশটির ভাগ্য। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র অঞ্চল থাকলেও এটি নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা এর আগে ছিল না। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সমান ভূখণ্ডেরও বেশি জায়গায় কী পরিমাণ মৎস্যসম্পদ, খনিজ সম্পদ, নৌ চলাচলসহ অন্যান্য কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে ১৯টি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র (টেরিটোরিয়াল সি), ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের অধিকৃত এই বিশাল অঞ্চলের সামুদ্রিক মাছ হতে পারে বছরে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি পণ্য। এর সঙ্গে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিতে জ্বালানির চাহিদা মেটাতেও সক্ষম হবে। এর সঙ্গে সমুদ্র-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে গোটা বাংলাদেশের ভাগ্যই বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দেশের সমুদ্র অঞ্চল কাজে লাগানোর জন্য ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে তাঁদের পরিকল্পনা শুনে সেগুলো আমলে নিয়েছেন।

অপার সম্ভাবনার খনিজ সম্পদ : জানা গেছে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে সরকার বেশ তৎপর। ইতিমধ্যে দুটি ব্লক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কম্পানি কনোকো-ফিলিপস, ভারতীয় কম্পানি ওএনজিসি ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক কম্পানি কৃশকে একটি করে ব্লক দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকের ইজারা পাওয়া কনোকো-ফিলিপস সম্প্রতি সরকারকে জানিয়েছে, সেখানে সাত ট্রিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস রয়েছে। এ পরিমাণ গ্যাস সেখানে পাওয়া গেলে বাংলাদেশের জন্য তা ১০ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপাসগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র অঞ্চল পেয়েছে । ইতিমধ্যেই প্রাপ্ত এ অঞ্চলে কী ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে তা জরিপ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সমুদ্রের তেল-গ্যাসসহ খনজ সম্পদ চিহ্নিত করার জন্য সাইসমিক সার্ভে করার অনুমতি দিয়েছেন। আমরা এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। এ বছরের মধ্যে সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করব।’ জানা গেছে, বাংলাদেশের পাশেই প্রতিবেশী ভারত কৃষ্ণা গোধাবেরি বেসিনে ১০০ টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কম্পানি ও রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানি ওএনজিসি। এ ছাড়া মিয়ানমারের সাগর ভাগেও পাওয়া গেছে বড় ধরনের গ্যাসের ভাণ্ডার। এ কারণে মনে করা হচ্ছে- বাংলাদেশের অধিকৃত সমুদ্র সীমায়ও বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ থাকতে পারে।

শুধু গ্যাসই নয়, বঙ্গোপসাগরে ভারী খনিজের (হেভি মিনারেলস) সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারী খনিজের মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এসব মূল্যবান সম্পদ সঠিক উপায় উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

সমুদ্র পরিবহনে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র : সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা দিয়ে প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় দুই হাজার ৬০০ জাহাজের মাধ্যমে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। এসব পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে জাহাজভাড়া হিসেবে বছরে ব্যয় হয় ছয় বিলিয়ন ডলার। এসব জাহাজের প্রায় সবই বিদেশি মালিকানাধীন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৮ সালে যেখানে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজের সংখ্যা ছিল ২৬টি, সেখানে ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৯টিতে। ফলে আমদানি-রপ্তানির পেছনে ব্যয় ছয় বিলিয়ন ডলার থেকে কিছুটা কমবে। ভবিষ্যতে আমদানি-রপ্তানিতে দেশীয় জাহাজের সংখ্যা বাড়লে এ খাতে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বাংলাদেশি জাহাজ যুক্ত হওয়ায় দেশে গড়ে উঠেছে শিপিং এজেন্সি, ফ্রেইট-ফরোয়ার্ডিং, ব্যাংক-বীমা খাত। এ খাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জানা গেছে, সরকার দেশের সমুদ্র ও জলপথকে ব্যবসাবান্ধব ও পণ্য আনা-নেওয়ায় সহজ করার জন্য ঢাকার পাশে নারায়ণগঞ্জের পানগাঁওয়ে নদীপথে কনটেইনার টার্মিনাল করেছে। এ কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে নৌপথে পরিবহন খরচ ৩০ শতাংশ কমে যাবে, কমবে সড়ক পথের ওপর চাপ। সমুদ্র অঞ্চলকে অধিকতর অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনাও নিয়েছে।
সম্ভাবনাময় মংস্য সম্পদ : মংস্য সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রতিবছর ৮০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ আমাদের দেশের জেলেরা ধরে থাকেন। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্য সম্পদের ১ শতাংশও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছেন না উন্নত ধরনের জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে।

জানা গেছে, ছোট ছোট নৌকার মাধ্যমে অগভীর সমুদ্রের ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশের জেলেরা মাছ ধরে থাকেন। প্রায় ৬০ হাজার ছোট ট্রলারের মাধ্যমে ৩০ লাখ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। মাছ ধরার জন্য নির্মিত বড় জাহাজ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলার) না থাকায় ২০০ নটিক্যাল মাইলের ভেতর ও বাইরের গভীর সমুদ্রের মংস্য সম্পদ থেকে কোনো আয় করতে পারছে না বাংলাদেশ।

জানা গেছে, কী পরিমাণ মংস্য সম্পদ বঙ্গোপসাগরে রয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য সরকারের হাতে নেই। বঙ্গোপসাগর এলাকায় মৎস্য সম্পদের ওপর ধারণা নেওয়ার জন্য সরকার মংস্য জরিপ জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, যদি আরো বেশি জাহাজের প্রয়োজন হয় তাহলে ভাড়া করতেও নির্দেশনা আছে। এ খাতে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার জন্য নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

মংস্য সম্পদ বিভাগের দাবি, সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুধু বিদেশে রপ্তানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া মাছ থেকে খাবার, মাছের তেল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ওষুধ, সস, চিটোসান তৈরি করা সম্ভব, যাতে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তা বিদেশে রপ্তানি করেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্প : জানা গেছে, জাহাজ তৈরি শিল্পে এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। দেশে এখন বিশ্বমানের জাহাজ তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া জাহাজভাঙা শিল্পও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মত। বিশ্বে জাহাজভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। পৃথিবীর মোট জাহাজ ভাঙার ২৪.৮ শতাংশ বাংলাদেশে সম্পাদিত হয়। দেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল এ শিল্পের জন্য কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে তা আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও সরকারের বিভিন্ন দপ্তর মত দিয়েছে।

লবণ বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে : সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সমুদ্রের লোনা পানিকে আটকে সূর্যের তাপ ব্যবহার করে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। লবণ চাষে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণ বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।

এ ছাড়া সমুদ্রকে ঘিরে পর্যটন শিল্প বিকাশের দারুণ সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খোরশেদ আলম বলেন, সমুদ্রসম্পদ আহরণে প্রয়োজন প্রযুক্তি। একই সঙ্গে গবেষণা ও সমীক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশে সমুদ্র নিয়ে এর আগে কখনো গবেষণা ও সমীক্ষা হয়নি। পাশাপাশি মৎস্য আহরণ ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে নেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। সমুদ্রে ৪৩৫ প্রজাতির মাছ আছে। কিন্তু মাছ ধরতে এখন মাত্র ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে নৌকা ও জাহাজ। তাই সমুদ্রসম্পদ আহরণে জাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে করতে হবে গবেষণা ও সমীক্ষা।

খোরশেদ আলম বলেন, ‘বিশ্বে বর্তমানে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে দক্ষ নাবিক লাগে। যদি আমরা নাবিক সরবরাহ করতে পারি তাহলে এ খাতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।’