আধুনিক ট্রান্সমিশন ও ডাটা নেটওয়ার্ক প্রকল্পঃ টেলিযোগাযোগে যুগান্তকারী উন্নয়ন

দেশব্যাপী উন্নত এবং আধুনিক শক্তিশালী ট্রান্সমিশন ও ডাটা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি ফাইলবন্দী অবস্থায় পড়ে ছিল। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রয়োজন বোধ করছে। হাতে নেয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান চীনের মেসার্স চায়না মেশিনারি এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) কাজটি বাস্তবায়নের জন্য কার্যাদেশ পেয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কাজটি পিছিয়ে যায়। বর্তমান সরকার প্রকল্পটির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। চীন সরকারের ঋণ সহযোগিতা এবং সরকারী অর্থায়নে চার বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ১২৬ কোটি ৯০ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে নানা কারণে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে উন্নয়নের জন্য আইসিটির প্রয়োগ চলছে বহুমাত্রিকভাবে। আর এটি নানা বিষয়ের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত। আছে ভৌগোলিক বিবেচনার বিষয়। নেপাল তার অবস্থান নির্ধারণ করেছে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের মধ্যকার গেটওয়ে হিসেবে। মালদ্বীপের কিছু সফটওয়্যার ডেভেলপার হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি সফটওয়্যার তৈরিতে সাফল্য পেয়েছে। এভাবে বিভিন্ন দেশ সাফল্য পেয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বাংলাদেশকেও তার সার্বিক অবস্থান বিবেচনা করেই উন্নয়নের ক্ষেত্রে আইসিটি উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নিতে হবে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে পেয়েছে ব্যাপক সাফল্য। ওই সব দেশের প্রকল্প অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর বিষয় কেমন সে দিকেও বিবেচনা করার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এ কারণেই উন্নত এবং আধুনিক শক্তিশালী ট্রান্সমিশন ও ডাটা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে।
বিটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে কারিগরি জটিলতার সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কাজ করেছে। এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সরকার আগ্রহী। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হবে। বর্তমানে আমাদের টেলিফোন সার্ভিস চলছে পুরনো আমলের ‘টাইম ডিভিশন মাল্টিফিক্সিং’ (পিডিএম) প্রযুক্তিতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারলে ‘মাল্টিমিডিয়া সার্ভিস (আইএমএস) আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিণত হবে। উন্নত বিশ্বে এখন এই প্রযুক্তি ব্যববহার হচ্ছে। ডিজিটাল সুইচ ব্যবস্থা থাকলেও দেশের টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহক সেবার দিক থেকে খুব একটা জুতসই প্রযুক্তি না। আমরা দেশব্যাপী টেলিযোগাযোগের উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছি গত বছরের অক্টোবরে। এই প্রকল্পটি টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটাবে। থাকবে আইএমএস (আইপি মাল্টিমিডিয়া সাব-সিস্টেম) সুইচিং সিস্টেম, একসেস নেটওয়ার্ক সিস্টেম, ভ্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, আইপি নেটওয়ার্ক, নেটওয়ার্ক সাপোর্ট এবং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। চার বছর মেয়াদের এই প্রকল্পে চীন ও বাংলাদেশ সরকার টাকার যোগান দেবে। পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ সেবার মানও বেড়ে যাবে। সম্প্রতি বিটিসিএলের একটি উচ্চ পর্যাযের প্রতিনিধিদল চীন ও কোরিয়া সফর করেছেন। এই প্রকল্পে যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হবে প্রতিনিধিদল তা দেখে এসেছেন।
এদিকে, বিটিসিএল ৫শ’ কোটি টাকার নেটওয়ার্ক উন্নয়নে আরেকটি প্রকল্প হাতে নিলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। ঠিকাদার নির্বাচনের পরও বিটিসিএলের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ছয় মাস ধরে ঝুলে আছে প্রকল্পটির চূড়ান্ত কার্যাদেশ। ফলে যে কোন সময় প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে দাতা সংস্থা জাইকা। ইতোমধ্যে বিটিসিএলকে চিঠি দিয়ে ক্ষোভের কথাও জানিয়েছে দেশের বৃহত্তম দাতা সংস্থা। উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ৫০ হাজার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ সুবিধা প্রায় সাড়ে তিনগুণ বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজারে উন্নতি হবে। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক গেটওয়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আসা কলের আরও উন্নীত হবে। এতে করে বিদেশী কলের ইনকামিং ও আউটগোয়িং ক্যাপাসিটি অনেক বাড়বে। তাছাড়াও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কেরও উন্নীত হবে। টেলিফোন, ইন্টারনেট, টেলিভিশন, অডিও, ভিডিও এবং ডাটা ট্রান্সফার সব এক তারেই চলবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের সব টেলিফোন মনিটরিং করা যাবে। ভিওআইপি চুরি শতভাগ বন্ধ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র কল করে কল মুছে দেয়ার যে কাজটি করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই কল মুছে ফেলা আর সম্ভব হবে না। এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাবে দেশের রাজস্ব ফাঁকির অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনায় সহায়তা করতে নামমাত্র সুদে জাইকা এই প্রকল্পে ৫শ’ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেয়নি বিটিসিএল। বিষয়টি নিয়ে দাতা সংস্থা জাইকা বেশ আগে বিটিসিএলকে চিঠি দিয়েছে। এরপরও বিটিসিএল এই প্রকল্পের বিষয়ে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না।
সূত্র জানিযেছে, বর্তমানে বিটিসিএলের রাজস্ব আয় ক্রমাগত কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে পিডিএম প্রযুক্তি। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করলে বিটিসিএলের অবস্থা আরও খারাপ হবে। প্রতিযোগিতামূলক টেলি-যোগাযোগ খাতে যেখানে অত্যাধুনিক সেবা সহজলভ্য, সেখানে শুধু ফিক্সড ফোনের গতানুগতিক সেবা প্রদানের বিপরীতে কারিগরি ও আর্থিক উভয় ক্ষেত্রেই টিকে থাকা বিটিসিএলের পক্ষে কঠিন হচ্ছে। বর্তমানে শুধু ফিক্সড ফোনের গতানুগতিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত আসা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এমনকি এ ধরনের নেটওয়ার্কের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পরিচালনা ব্যয়ের সমান আয় করা সম্ভব হয় না। কিন্তু ফিক্সড ফোন অপারেটর অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্বল্প খরচে উচ্চগতির ডাটা সার্ভিস প্রদান করা সম্ভব, যা মোবাইল ফোনের ডাটা সার্ভিসের চেয়ে অনেক কম খরচ হবে। প্রকল্পের আওতায় সাত লাখ লাইন ক্যাপাসিটির আইএমএস প্ল্যাটফরম স্থাপন করা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইএমএ প্ল্যাটফরম স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে সাতটি বিভাগীয় শহরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সেবা দেয়া হবে। সেবা খরচও হবে কম। প্রকল্পের একসেস নেটওয়ার্কের আওতায় প্রাহকদের প্রচলিত কপার কেবলের পরিবর্তে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে। স্থাপিত ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করা হবে। এছাড়া ঢাকা-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন একটি অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন লিঙ্ক স্থাপনের কথা রয়েছে। এই লিঙ্ক সাবমেরিন কেবলের ব্যান্ডউইথের বহন নিশ্চিত করবে।
জানা গেছে, ২০০৯ সালে চার বছর মেয়াদী আধুনিক এনজিএন (নিউ জেনারেশন নেটওয়ার্ক) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা প্রদানের জন্য ‘ইনস্টলেশন অব এনজিএন বেজড টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল বাংলাদেশ (এনটিএন)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পটি এখনও বিটিসিএলে ফাইলবন্দী অবস্থায় রয়ে গেছে।