মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য পাতক্ষীরঃ স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় যাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকায়

পাতক্ষীর বিক্রমপুরের ঐতিহ্য। এ ক্ষীর স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়। যাঁরা এ ক্ষীর খেয়েছেন নিশ্চয়ই তাঁরা জানেন এবং বোঝেন এর মজা। গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি সুস্বাদু এ খাবারের চাহিদা সুদূর ইউরোপ ও আমেরিকায়ও আছে। শতাব্দী-প্রসিদ্ধ এ খাবারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে দেশ-বিদেশে। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ ক্ষীরের প্রসার আরও বাড়বে বলে এর কারিগররা মনে করেন। একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে তৈরি হয় বিশেষ এই মুখরোচক খাবার। ঐতিহ্যবাহী নানা উৎসবে এ ক্ষীরের পরিবেশন থাকবেই। না হলে যেন আয়োজনের অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই বিক্রমপুরের মেহমানদারি বা বড় বড় আয়োজনে এই পাতক্ষীর থাকবেই। আর গেল রোজার ঈদেও এই পাতক্ষীরের কদর ছিল অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি। অনেকেই মেহমান আপ্যায়নে সেমাই, পায়েসের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষীর পরিবেশ করে অনুষ্ঠানে বাড়তি মাত্রা যুক্ত করে থাকেন।
প্রতিদিন কয়েক মণ দুধ ব্যবহার হয় এ খাবার তৈরিতে। সব মৌসুমে এর চাহিদা থাকলেও শীতে চাহিদা বাড়ে অনেক বেশি। বাঙালী ঐতিহ্যের পাটিসাপটা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। নতুন জামাইয়ের সামনে পিঠাপুলির সঙ্গে এ ক্ষীর ব্যবহার না করা যেন বেমানান। গ্রাম-বাংলায় মুড়ির সঙ্গেও এ ক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি প্রচলিত রয়েছে।
সন্তোষপুর গ্রামের সাতটি পরিবার এখনও এ ক্ষীর তৈরির কাজে জড়িত। তবে জনশ্রুতি আছে যে, পুলিনবিহারী দেব নামে এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সর্বপ্রথম নিজ বাড়িতে এ ক্ষীর তৈরি শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে তা জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করতে থাকেন বলে তাঁর উত্তরসূরিরা জানান। একদা ইন্দ্রমোহন ঘোষ এবং লক্ষ্মীরানী ঘোষও তৈরি করতেন এ ক্ষীর। এখন তাঁদের বংশধররাই বানাচ্ছেন পাতক্ষীর। তাঁদের উত্তরসূরি কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মধুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ এ পেশায় রয়েছেন। তবে সুনীল ঘোষের ৫ ভাই আছেন এ পেশায়। ক্ষীর তৈরিতে পারদর্শী লক্ষ্মীরানী বলেন, প্রতিটি পাতক্ষীর তৈরি করতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বাল দিতে হয় এ দুধ। দুধের সঙ্গে প্রায় ৫০ গ্রাম চিনি ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছুই প্রয়োজন হয় না এ ক্ষীর তৈরিতে। তবে ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে ওইটুকু চিনিও দেয়া হয় না। তারপর যখন দুধ ঘন হয়, তখন মাটির দইয়ের পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে রাখা হয়। ঘণ্টাখানেক পর ঠা-া হলে তা কলাপাতায় পেঁচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতযশ ও কৌশলের কথাও বলেন অনেকে। দুধ ঘন করতে গেলে দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে দুধ নাড়তে হয় অনবরত।
হ্যাঁ, তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষীর কলাপাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই এর নাম হয়েছে পাতক্ষীর-বললেন সুনীল। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরি হয় ৫০টির বেশি। প্রতিটি ক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষীরের মূল্য ২শ’ টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষীরের দামও। একেকটি পাতক্ষীরের ওজন আধা কেজি। দুটো মিলে হয় এক কেজি। তবে গত ঈদে দুধের দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রি হয়েছে ৫শ’ টাকা কেজি দরে। ঈদ মৌসুম শেষে দুধের দর কমলে ক্ষীরের মূল্যও হ্রাস পায়।
বিনয় ঘোষ বলেন, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর তৈরি হয় এ ক্ষীর। তবে প্রতিটি ক্ষীরে ১০-২০ টাকার বেশি লাভ হয় না। দোকানে বিক্রি ছাড়াও বাড়িতে এসে অর্ডার দিয়ে থাকে অনেকে। আমেরিকা, ইতালি, জার্মান, ফ্রান্স ও জাপান থেকেও এ ক্ষীরের অর্ডার আসে।
এই ক্ষীর তৈরির ব্যতিক্রম একটি দিক হচ্ছে-এ সব পরিবারের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে পড়ে। তবে এ সব বাড়িতে বৌ হয়ে যাঁরা আসেন তাঁদেরই এ কাজ শেখার রীতি রয়েছে। সন্তোষপাড়ার ঘোষবাড়ির কন্যা শ্যামলী ঘোষ মাস্টার্স শেষ করে এখন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। তাঁর মা পাতক্ষীর তৈরিতে পটু হলেও শ্যামলী কিন্তু পাতক্ষীর তৈরি করতে পারেন না। কিন্তু তাঁর বৌদি কয়েক দিনেই রপ্ত করে ফেলেছেন। শ্যামলী ঘোষ আরও বলেন, চেষ্টা করলে যে পারব না তা নয়, কখনও চেষ্টা করিনি।
পাতক্ষীর মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে শতবর্ষ ধরে। এ ছাড়া বিক্রমপুরের দই, মিষ্টি, মাওয়ার রসগোল্লা, চিত্তার দোকানের রসগোল্লা, ছানার আমৃত্তি ও দই বেশ জনপ্রিয়। আর সুস্বাদু রসমালাইতো রয়েছেই। কিন্তু সব কিছুকেই ছাপিয়ে পাতক্ষীরের ঐতিহ্য সবচেয়ে বড় একটি জায়গা দখল করে আছে।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরকে আরও জনপ্রিয় করতে এবং এর প্রস্তুতকারকদের সার্বিক সহয়তা করতে প্রশাসন সহযোগিতার হাত বাড়াবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেন, ‘এই জনপদে ঐতিহ্যের খাবারের নাম এলেই পাতক্ষীরের নাম আসে সবার আগে। তাই এর সঙ্গে জড়িতদের পৃষ্ঠপোষকতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’