বড় জাহাজও ভিড়তে পারবে চট্টগ্রাম বন্দরে

* পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় সাশ্রয় হবে * সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু

চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ভিড়তে পারবে বড় জাহাজ। এর ফলে কন্টেইনার ও সাধারণ পণ্যবাহী দুই ধরনের জাহাজই বর্তমানের চেয়ে বেশি পণ্য নিয়ে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে বন্দর জেটি ও টার্মিনালে সর্বোচ্চ ১৮৬ মিটার ও সাড়ে আট মিটার গভীর জাহাজ ভেড়ার অনুমতি রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৯০ মিটার দীর্ঘ ও সাড়ে ৯ মিটার গভীরতার জাহাজগুলো ভেড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়বে, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে খরচ বর্তমানের চেয়ে অনেক কমে আসবে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ড্রেজিং করে কর্ণফুলীর নাব্যতা বাড়িয়ে বন্দর চ্যানেল দিয়ে বড় ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। এখন সব কিছুই প্রস্তুত, আগামী মাসের শুরুর দিকে বন্দর ব্যবহারকারীদের জানিয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।’

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৮৬ মিটার দীর্ঘ ও সাড়ে আট মিটার গভীরতার জাহাজ পণ্য নিয়ে বন্দর জেটি ও টার্মিনালে ভিড়ছে। তবে তিন বছর আগে বিশেষ বিবেচনায় ১৮৯ মিটার দীর্ঘ জাহাজ জেটিতে ভেড়ার অনুমতি প্রদানেরও রেকর্ড ছিল বন্দরের। এ বিশেষ বিবেচনা নিয়ে বেশ অনিয়ম হতো তখন। কিন্তু ঝুঁকি বিবেচনায় সেই সময় বিশেষ আদেশ জারি করে বিশেষ বিবেচনায় জাহাজ ভেড়ানোর অনুমতি বন্ধ করে দেয় বন্দরের হারবার ও মেরিন বিভাগ। এরপর থেকে বিগত তিন বছর নির্ধারিত দৈর্ঘ্যের বড় জাহাজ জেটিতে প্রবেশ বন্ধ ছিল।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ২০১৪ সালের ২ মার্চ বন্দরের বোর্ডসভায় ১৯০ মিটার দীর্ঘ ও সাড়ে ৯ মিটার গভীরতার জাহাজ জেটিতে ভেড়ানোর অনুমতির সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিনা খরচে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নদী খনন করে নাব্যতা বাড়ানোর কাজ শুরু করে। বন্দর জেটিতে বড় জাহাজ প্রবেশের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সংকীর্ণ গুপ্তা বাঁক। জেটিতে প্রবেশের জন্য সেখানে প্রত্যেক জাহাজকে ৯০ ডিগ্রি ঘুরে প্রবেশ করতে হচ্ছে। এখন সেখানে নাব্যতার পাশাপাশি কিছুটা প্রশস্ততাও বাড়ানোর দাবি বন্দর কর্তৃপক্ষের।

জেএসি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিমুল মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ব নৌ-বাণিজ্যে ১৮৬ মিটারের জাহাজ খুঁজে পাওয়া এখন অনেক কঠিন। তাই পুরনো জাহাজ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। বিশ্বে সব জাহাজই ১৯০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের, ফলে এখন দেশে পণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে।’

শিমুল মজুমদার বলেন, ১৮৬ মিটারের জাহাজে ৩০ হাজার টন পণ্য আনলেও বহির্নোঙ্গরে ছয় হাজার টন স্থানান্তর করে জাহাজের গভীরতা কমিয়ে ২৪ হাজার টন নিয়ে জেটিতে প্রবেশ করতে হয়। এতে প্রচুর খরচ হয়। আর ১৯০ মিটারের জাহাজে কমপক্ষে ৪০ হাজার টন পণ্য নিয়ে জাহাজ জেটিতে কম খরচে প্রবেশ করতে পারবে।

সাধারণ পণ্যের জাহাজের পাশাপাশি কন্টেইনার জাহাজেও পণ্য পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। বর্তমানে সিঙ্গাপুর, পোর্ট কেলাং ও কলম্বো পোর্ট থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে প্রবেশের উপযোগী ফিডার (ছোট) জাহাজ আসে। ১৮৬ মিটারের কম দৈর্ঘ্যের জাহাজগুলো ৬০০ থেকে এক হাজার ২০০ একক কন্টেইনার পরিবহনে সক্ষম। কিন্তু ১৯০ মিটারের জাহাজগুলো এক হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার একক কন্টেইনার পরিবহনে সক্ষম।

জানতে চাইলে কে লাইনস শিপিংয়ের মহাব্যবস্থাপক শাহেদ সারোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯০ মিটারের জাহাজ এই রুটে চললে একসঙ্গে বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারায় খরচ সাশ্রয়ী হবে নিশ্চিত। তখন শিপিং কম্পানিগুলোর মধ্যে সাশ্রয়ী রেটে দেওয়ার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হবে। আর শেষ পর্যন্ত সুফল ভোগ করবে ভোক্তা, আমদানি-রপ্তানিকারকরাই।’

১৮৬ মিটারের বড় জাহাজ জেটিতে প্রবেশ করতে না পারায় আমদানিকৃত ৬০ শতাংশ পণ্য বহির্নোঙ্গরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে স্থানান্তর করতে হয়। এরপর সেই জাহাজগুলো আবার জেটিতে আনতে হয়। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বন্দর জেটিতে পণ্য ওঠানামা বেড়ে যাবে।