তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বৈদেশিক সহায়তা

উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ে নতুন রেকর্ড হয়েছে। স্বাধীনতার ৪২ বছরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সবেচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা পেয়েছে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে। বিদায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশ বাংলাদেশের জন্য তিন বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ২৮১ কোটি ডলার পেয়েছিল বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ইআরডি সূত্রে জানা যায়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিসংতার কারণে বছরের প্রথম ছয় মাস উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ে ছিল ধীরগতি। কিন্তু নির্বাচনের পর দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় অর্থ ছাড়ের পরিমাণ বেড়েছে।

তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়াল বৈদেশিক সহায়তা

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের রেকর্ড হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে গত বছর চীনের কাছ থেকে বড় ধরনের ঋণ পাওয়া গেছে, যা আগের বছরগুলোতে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপড়েন থাকলেও অর্থ ছাড়ে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং বিদায়ী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক এ সংস্থাটি। অনুদানও পাওয়া গেছে বিগত বছরের তুলনায় বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চুক্তির আওতায় অর্থ ছাড় হওয়ায় বৈদেশিক ঋণ সহায়তা পাওয়ার রেকর্ড হয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২২২ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ, যা এযাবৎকালে তৃতীয়। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে ২১২ কোটি ডলার ছাড় হয়েছিল, যা ছিল চতুর্থ।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদেশিক অর্থ ছাড়ে রেকর্ড হয়েছে, এতে গর্বিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে যে পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ পাওয়ার আশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। বছরের মাঝামাঝি সময়ে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ২৯৫ কোটি ডলার করা হয়েছিল। এ ছাড়া চীন থেকে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এর সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, চীনের ঋণের সুদের হার বেশি, শর্তও বেশি। এই ঋণ না নিলে ভালো হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইআরডি সূত্রে জানা যায়, আগের বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে যে ঋণ নিয়েছিল তার মূল, সুদসহ গত বছর পরিশোধ করা হয়েছে ১২৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে মূল ছিল ১০৩ কোটি ডলার আর সুদ ছিল ২০ কোটি ডলার। সে হিসাবে গত এক বছরে নিট বৈদেশিক ঋণ সহায়তা পাওয়া গেছে ১৭৭ কোটি ডলার। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে নিট ১৭০ কোটি ডলার পেয়েছিল সরকার।

জানা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে যে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পাওয়া গেছে, এর মধ্যে অনুদান ছিল ৭২ কোটি ডলার। বাকি ২২৮ কোটি ডলার পাওয়া গেছে ঋণ বাবদ। তবে গত বছর প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বিদায়ী অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে ৫৮৪ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল বাংলাদেশ। এর আগের বছর সে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৮৫ কোটি ডলার। সে হিসাবে প্রতিশ্রুতি কমেছে এক কোটি ডলার।

ইআরডি প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হলেও গত বছর সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে সংস্থাটি। এ সময়ে বিশ্বব্যাংক অর্থ ছাড় করেছিল অনুদান বাদে ৮১ কোটি ডলার। এর আগের বছরে ছাড় হয়েছিল ৭৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ সময়ে ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটি ছাড় করেছে ৪৭ কোটি ডলার। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। গত বছর দেশটি থেকে সাড়ে ৪৬ কোটি ডলার পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) থেকে পাওয়া গেছে ৩৪ কোটি ডলার।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে যেসব প্রকল্প চলছে, সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বেড়েছে। এ ছাড়া মনিটরিং এবং ফলোআপ বেড়েছে। এ কারণে বৈদেশিক অর্থ ছাড়ের রেকর্ড হয়েছে। তিনি বলেন, আগে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু গত বছর প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে সমস্যা সমাধানে বৈঠক হয়েছে।

গত বছর উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদানের পরিমাণও বেড়েছে। এ সময়ে ভারত ১৫ কোটি ডলার অনুদান ছাড় করেছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ট্রাস্ট ফান্ডে ছাড় হয়েছে ১৪ কোটি ডলার। জাতিসংঘের অধিভুক্ত সংস্থাগুলো ছাড় করেছে ১৮ কোটি ডলার। এ ছাড়া জার্মানি সাত কোটি এবং ডিএফআইডি ১৩ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে।