পাহাড়ে লেবুচাষঃ কাগজী চায়না ঝোটা শরবতী- নানা জাত ফিরছে ভাগ্য

বিশাল এলাকাজুড়ে লেবু বাগান আর লেবু বাগান। রয়েছে কাগজী লেবু, জারা লেবু, ঝোটা লেবু, চায়না লেবু, এলাচি লেবু ও শরবতী লেবুসহ বিভিন্ন জাতের লেবু। বাগানের গাছগুলো লেবুতে ভরে গেছে। কোন কোন গাছে থোকা থোকা লেবুর ভারে নুয়ে পড়ছে। এখন লেবুর ভরা মৌসুম। প্রতিদিন ভোর থেকে চাষীরা বাগান থেকে লেবু সংগ্রহ করে টুকরি ভর্তি করে ও কাপড় মুড়িয়ে কাঁধে করে পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে বাজারে নিয়ে আসে। প্রতিবছর লেবুর মৌসুমে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দোহাজারী, বাগিচাহাট, খাঁনহাট, কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, বাদামতলা, রৌশনহাট, কমলমুন্সির হাট, চক্রশালাসহ বিভিন্ন স্থানে লেবু বিক্রির অস্থায়ী হাট বসে। পাইকারী ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা এখান থেকে লেবু ক্রয় করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে নিয়ে যায়।
চাষীরা জানান, এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন দেড় শ’ থেকে দুই শ’ ট্রাক লেবু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। পটিয়া-চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লেবু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে অনেক চাষী। সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জেও লেবুর বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। লেবু চাষ দিনদিনই জনপ্রিয় হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া লেবু কেবল দেশে নয়, বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত লেবু স্বাদে, ঘ্রাণে ও গুণে-মানে সেরা। বিধায় স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি মন জয় করছে দেশের বাইরের ক্রেতাদেরও।
লেবু চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ লেবু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে জানা গেছে। অনেক অঞ্চলের বহু বেকার যুবকের ভাগ্যও বদলে দিয়েছে লেবু চাষ। তবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে লেবু চাষের সাফল্য এখনও নির্দিষ্ট পর্যায় পার হতে পারছে না। গ্রামীণ দরিদ্রচাষীরা উন্নত প্রযুক্তি, ভাল দাম এবং সংরক্ষণের সুযোগ পেলে লেবু চাষ কৃষি সাফল্যের উদাহরণ হয়ে থাকবে। লেবুও অর্থকরী ফসলের তালিকায় এর নাম লেখাতে সক্ষম হবে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন লালুটিয়া, ধোপাছড়ি, সাঙ্গু ও পটিয়ার শ্রিমাই, গুণগুরি বিটের প্রায় ২০ হাজার একরের অধিক এলাকাজুড়ে নানা জাতের লেবুর আবাদ করা হয়েছে। এছাড়া চন্দনাইশ, দোহাজারি ও পটিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় কাগজী লেবু, জারা লেবু, শরবতী লেবু ও এলাচি লেবুসহ নানাজাতের লেবুর চাষ হচ্ছে। বেশিরভাগ এলাকাতেই বাম্পার ফলন হচ্ছে। জলাবদ্ধতা না থাকা, পাহাড়ী উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া এ অঞ্চলে লেবু চাষের জন্য খুবই উপযোগী। নিজেদের আগ্রহেই লেবু চাষ শুরু করেন এলাকার মানুষ। পাহাড়ী অনাবাদী জমিতে তাদের এই সাফল্য একটা বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
লেবু চাষ করে দেশের ভাগ্যটাকেই বদলে দেয়া যায়। অব্যবহৃত পাহাড় আর টিলায় লেবু চাষ করে প্রতিবছর আয় করা যায় কয়েক শ’ কোটি টাকা। লেবু কিংবা লেবুর জুস বিদেশে রফতানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। আর এ অপার সম্ভাবনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের অব্যবহৃত পাহাড়গুলো। লেবুর উৎপাদন দিনদিনই বাড়ছে। শুরু হয়েছে এর বাণিজ্যিক চাষ। প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার লেবু বাগানে উৎপাদিত হয় ১০ হাজার টন লেবু। কেবল দেশেই নয়, বিদেশেও বেড়েছে এর চাহিদা। ব্যাপক চাষাবাদের মাধ্যমে লেবুকে প্রধান অর্থকরী ফসলের তালিকায় আনা সম্ভব। পাহাড়ে লেবু চাষ করে ভাল ফলন পাচ্ছে লেবু চাষীরা। ফলে লেবু চাষে আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে তারা।
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, কৃষি বিভাগের প্রচার-প্রচারণা, বেকার শিক্ষিত যুবসমাজকে লেবু চাষে উদ্বুদ্ধকরণ এবং লেবু চাষীদের স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করলে লেবু থেকে প্রতিবছর কয়েক শ’ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এছাড়া বেকার সমস্যার সমাধান, পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে লেবু চাষের মাধ্যমে। বিভিন্ন প্রসাধনী ও কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো লেবুর বড় ক্রেতা। এছাড়া বিভিন্ন বেভারেজ কোম্পানি ও লেমন কোল্ড ড্রিংকসের জন্য কাগজী লেবু কিনছে অনেক কোম্পানি। ফলে চাষীরা দামও ভাল পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েক লেবু চাষী। অপরদিকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা, সৌদি আরব ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত লেবু রফতানি হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে বহু বেকার যুবক লেবু চাষের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেও সম্ভাবনাময় এ খাতটি বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারছেন না। ব্যাপক হারে লেবু উৎপাদিত হলেও যোগাযোগ সমস্যা এখনও বড় সমস্যা রয়ে গেছে। দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে বাগান থেকে বাজারে লেবু আনতে খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় আড়তদারদের বেঁধে দেয়া দামেই লেবু বিক্রি করতে বাধ্য হয় চাষীরা। ঋণগ্রস্ত অনেক চাষী বাধ্য হয়েই গাছে থাকা অবস্থায়ই লেবু বিক্রি করে দেয় বলে ভাল দাম পায় না। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় কৃষি বিভাগকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তারা।
শ্রীমঙ্গলের ৩ হাজার বাগানে প্রতিবছর উৎপাদিত হয় সাড়ে তিন হাজার টন কাঁচালেবু। এখানকার লেবু যাচ্ছে বিদেশেও। কাগজী লেবুর চাষাবাদ লাভজনক হওয়ায় মৌলভীবাজার জেলায় কাগজী লেবু চাষের প্রতি চাষীদের আগ্রহ বাড়ছে। মৌলভীবাজার জেলায় এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হয়। জেলার সাত উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার লেবু বাগান রয়েছে। যার সঙ্গে মালিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার লোক সম্পৃক্ত। বিভিন্ন প্রসাধনী ও কেমিক্যাল কোম্পানি কিনে নিচ্ছে কাগজী লেবু। তাছাড়া বেভারেজ কোম্পানিগুলোও লেমন কোল্ড ড্রিঙ্কসের জন্য বিপুল পরিমাণ কাগজী লেবু কিনছে। সারাবছর কাগজী লেবু উৎপাদন হলেও ভরা মৌসুমে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে দামও অনেকটা কমে যায়। প্রতিবছর শুধু শ্রীমঙ্গলেই কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার কাগজী লেবু বেচাকেনা হয়ে থাকে। মৌলভীবাজার জেলার বিস্তীর্ণ টিলা ও সমতল ভূমির দিগন্তজুড়ে কাগজী লেবুর বাগান। উঁচু-নিচু টিলা, পাহাড়ের ঢাল, ফসলী জমির মাঠ, বাড়ির আঙ্গিনাসহ আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে এসব কাগজী লেবুর বাগান। আদিকাল থেকে মৌলভীবাজারে বিভিন্ন প্রজাতির লেবুর চাষ কমবেশি হলেও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ শুরু হয় ষাটের দশক থেকে। লাভজনক হওয়ায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও বড়লেখায় কাগজী লেবুর ব্যাপক চাষাবাদ করা হচ্ছে। চাষীদের উৎসাহ দিনদিন বাড়ছে। তবে শ্রীমঙ্গলে এর চাষাবাদ হয় সবচেয়ে বেশি। এ এলাকার কাগজী লেবু অন্য অঞ্চলের কাগজী লেবুর চেয়ে স্বাদ, গন্ধ ও আকৃতিতে আলাদা। শ্রীমঙ্গলের কাগজী লেবুর চাহিদা দেশে যেমন রয়েছে, তেমনি বিদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। প্রতিবছরেই লন্ডনসহ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রীমঙ্গলের কাগজী লেবু রফতানি করা হয়ে থাকে।
অধিক লাভজনক হওয়ায় চন্দনাইশ-পটিয়ার চাষীরা এখন অন্য ফসলের পরিবর্তে লেবু চাষের দিকে ঝুঁকছে। সত্তরের দশকে এ এলাকায় লেবু চাষ শুরু হয়। বর্তমানে লেবু চাষ দ্রুত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রূপ নেয়। এলাকার অনেক বেকার যুবক লেবু চাষকে আঁকড়ে ধরে নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন লালুটিয়া, ধোপাছড়ি, সাঙ্গু ও পটিয়ার চিমাই, গুণগুরি বিটের প্রায় ২০ হাজার একরের অধিক এলাকা জুড়ে নানা জাতের লেবু আবাদ করা হয়েছে। চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, লট এলাহাবাদ, দোহাজারী, জামিজুরি, জঙ্গল জামিজুরি, হাশিমপুর, ধোপাছড়ি, সামুকছড়ি, ছামাছড়ি, শান্তিবাজার, সাঙ্গু এবং পটিয়ার চক্রশালা, কেলিশহর, হাইদগাঁও, হরনা, রতনপুর, লামারখিল, চিমাইসহ বিশাল এলাকাজুড়ে লেবু বাগান আর লেবু বাগান। রয়েছে কাগজী লেবু, জারা লেবু, ঝোটা লেবু, চায়না লেবু, এলাচি লেবু ও শরবতী লেবুসহ বিভিন্ন জাতের লেবু। বাগানের গাছগুলো লেবুতে ভরে গেছে। কোন কোন গাছে থোকা থোকা লেবুর ভারে নুয়ে পড়ছে। পটিয়া-চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লেবু চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে অনেক চাষী। বর্তমানে লেবুর ভরা মৌসুম। প্রতিদিন ভোর থেকে চাষীরা বাগান থেকে লেবু তুলে টুকরি ভর্তি করে ও কাপড় মুড়িয়ে কাঁধে করে পাহাড়ী আঁকা-বাঁকা পথ বেয়ে বাজারে নিয়ে আসে। প্রতিবছর লেবুর মৌসুমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দোহাজারী, বাগিচাহাট, খাঁনহাট, কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, বাদামতলা, রৌশনহাট, কমলমুন্সির হাট, চক্রশালাসহ বিভিন্ন স্থানে লেবু বিক্রির অস্থায়ী হাট বসে। পাইকারী ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা এখান থেকে লেবু ক্রয় করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে নিয়ে যায়।
চাষীরা জানান, এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০-৫০ ট্রাক লেবু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সরবরাহ করা হয়। লেবু বাগান মালিক সমিতির কর্মকর্তারা জানান, চন্দনাইশ ও পটিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৫-৬ কোটি টাকার লেবু উৎপাদিত হয়। লেবু চাষের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আন্তরিক হয়ে লেবু চাষীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, লেবু সংরক্ষণের জন্য কোল্ডস্টোরেজ ও সাধারণ বিক্রি কেন্দ্র স্থাপন এবং লেবু চাষীদের কৃষি প্রযুক্তির আওতায় আনতে পারলে এ এলাকার চাষীরা লেবু চাষ করে মজবুত অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।