দখল, দূষণ, অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধে নদী রক্ষা কমিশন হচ্ছে

রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গেজেট

শীঘ্র জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। অবৈধ দখল, দূষণ রোধ, অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধ করার জন্য স্বাধীন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হচ্ছে। কমিশন গঠনের পর থেকে দেশের নদী রক্ষার প্রধান দায়িত্বই পড়বে কমিশনের উপর।
জানতে চাইলে নৌপরিবহন সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, শীঘ্র কমিশন গঠন করা হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির কাছে কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেয়ার পর গেজেট প্রকাশ করা হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের নদী রক্ষায় এই কমিশন গঠন করা হচ্ছে বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, গত বছর নবেম্বরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এর চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের জন্য তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠন করে মন্ত্রণালয়। অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক করা হয় পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পি কে এস এফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদকে। কমিটির সদস্য এবং সদস্যসচিব ছিলেন যথাক্রমে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আইনুন নিশাত এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোঃ আলাউদ্দিন।
জানতে চাইলে কমিটির সদস্য প্রফেসর আইনুন নিশাত জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পরই দু’তিনবার বসেছি। আমাদের কাছে যারা যোগ্য মনে হয়েছে যথাসময়ে তাদের নাম সুপারিশ করা হয়েছে। এখন বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভর করছে।
নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প কারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদী দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নৌ-পরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ গত ২২ জুলাই রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, স্থায়িভাবে নদীর সমস্যা সমাধানের জন্য নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হচ্ছে। কমিশন সারাদেশের নদী নিয়ে কাজ করে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করবে। সরকার সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করবে। বিগত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ নদী রক্ষায় একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে। ওই টাস্কফোর্স প্রতিমাসে একবার বৈঠকে মিলিত হলেও নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পরিবেশ দূষণ রোধ করে নদী রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। সরকার নদী রক্ষায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু করছে। যাতে ভবিষ্যতে নদী অবৈধ দখলে না যায় সে জন্য স্থায়িভাবে কমিশন গঠন বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আইনে বলা হয়েছে কমিশনের ৮টি কাজ নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এ ছাড়া দখলমুক্ত, উচ্ছেদ, পানি দূষণ, বিলুপ্ত বা মৃত নদী খনন, নদী উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণা ও নদী সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার সৃষ্টি এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারকে কমিশন সুপারিশ প্রদান করবে।
সূত্রমতে একজন চেয়ারম্যান এবং অনধিক পাঁচ সদস্য নিয়ে কমিশন গঠন করা হবে। কমিশনের একজন চেয়ারম্যান এবং একজন সদস্য হবে সার্বক্ষণিক। অন্য সদস্যরা অবৈতনিক হবেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একজন করে নদী বা পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং মহিলা সদস্য থাকবেন। চেয়ারম্যান কমিশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বিবেচিত হবেন। কমিশনে একজন সচিব থাকবেন। কমিশন সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে।
কমিশনের চেয়ারম্যানও একজন সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে ৩৫ বছরের কম বা ৬৫ বছরের অধিক বয়সী কোন ব্যক্তিকে কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে নিয়োগ দেয়া হবে না। জনপ্রশাসন, মানবাধিকার, শিক্ষা, নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ কার্যক্রম, সমাজসেবা এবং মানব কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে থেকে চেয়ারম্যান এবং সদস্য নির্বাচন করা হবে। কমিশন প্রধানের কার্যালয় হবে ঢাকায়। কমিশন প্রয়োজন মনে করলে সরকারের অনুমতি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে।
মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, নদী কমিশনের গঠন নদী রক্ষায় সরকারের সদিচ্ছাকে আরও বেগবান করবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই নদী রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য দেশের সকল নদী খনন করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে নতুন ড্রেজার সংগ্রহের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। শীঘ্রই এগুলো হাতে পাওয়া যাবে। আর যাতে কখনও কেউ নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ না করতে পারে সে জন্য সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কমিশন গঠন করলে শুধু নদী নিয়ে কাজ করার জন্য পৃথক কমিশন গঠিত হব।