মেঘনার পানি ঢাকায় সরবরাহ ॥ ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে ১০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি

ঢাকা ওয়াসার গান্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে সহায়তাই মূল লক্ষ্য
 
ফিরোজ মান্না ॥ ঢাকায় পরিবেশবান্ধব পানি সরবরাহের জন্য ইউরোপিয়ান বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ৭৮০ কোটি টাকার (দশ কোটি মার্কিন ডলার) একটি সহায়তা ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ‘বিষনন্দী’ নামক পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন মেঘনা নদীর ৫০ কোটি লিটার পানি রাজধানীতে সরবরাহ করার লক্ষ্যে ইআইবি ঢাকা ওয়াসাকে গান্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে সহায়তা দেবে।
২০২১ সালের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা তার মোট উৎপাদনের ৮৭ ভাগ পানি ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যে গান্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প করা হবে। ঢাকা শহরের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব পানি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি উত্তোলন ক্রমান্বয়ে হ্রাস করাও এ প্রকল্প গ্রহণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ঢাকায় পরিবেশবান্ধব পানি সরবরাহ প্রকল্প আগামী ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। ৬৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ প্রকল্পের অর্থায়নে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি), ফ্রেঞ্চ এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট (এএফডি) ও বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে এডিবি ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ইআইবি ও এএফডি উভয়ে এক শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে এবং বাংলাদেশ সরকার ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা করবে।
সায়েদাবাদ ফেজ-২ চালু হওয়ার পরই এই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে মহানগরীতে লোক সংখ্যাও ততই বাড়ছে। মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে। আগামী দিনে ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই ভূ-উপরিভাগের পানির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্প শেষ হলে দৈনিক আরও ৪৫ কোটি লিটার পানি নগরীতে সরবরাহ হবে। চীন সরকারের সহায়তায় ৩ হাজার ৩৩৬ দশমিক ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মাওয়ার জসলদিয়া পয়েন্ট থেকে পদ্মার পানি এনে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আরও একটি বৃহৎ পানি শোধনাগার নির্মাণ হচ্ছে। এ ছাড়াও ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদী থেকে পানি এনে খিলক্ষেতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আরও একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। 
সূত্র জানায়, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-১-এর পর ফেজ-২ প্রকল্পের আওতায় সায়েদাবাদ প্ল্যান্ট কম্পাউন্ডে নির্মাণ করা হয়েছে একটি প্রি-ট্রিটমেন্ট ইউনিট। প্রতিবছর তিন থেকে চার মাস বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীর পানির স্তর নেমে পানির গুণগত মান কমে যায়, তখন প্রি-ট্রিটমেন্ট ইউনিট চালিয়ে শীতলক্ষ্যার পানি প্রাথমিকভাবে শোধন করে চূড়ান্ত শোধনে পাঠানো হবে। ফলে অতিরিক্ত কেমিক্যালের গন্ধমুক্ত পানি সরবরাহ পাবেন নগরবাসী। সরকারের ২০০৯ সালে ক্ষমতা নেয়ার পর ঢাকা ওয়াসার পানি উৎপাদন ও সরবরাহ ক্ষমতা ছিল দৈনিক ১৮৫ কোটি লিটার। এখন সায়েদাবাদ ফেজ-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় পানির উৎপাদন বেড়ে গেছে আরও সাড়ে ২২ কোটি লিটার। একই সঙ্গে ওয়াসা বেশ কিছু ডিপটিউবওয়েল স্থাপনের কারণে বর্তমানে ওয়াসার উৎপাদন ক্ষমতা গত ৪ বছরে ১৮৫ কোটি লিটার থেকে বেড়ে ২৪১ থেকে ২৪৩ কোটি লিটারে উন্নীত হয়েছে। তা ছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে পানি সঙ্কট এতটা তীব্র হয়নি। এমনকি পাম্পগুলোতে সেনা মোতায়েনও করা হয়নি। 
জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে ৮৭ ভাগ ভূগর্ভস্থ পানি এবং বাকি ১৩ ভাগ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে সরবরাহ করছে। তবে সাসটেনেবল ওয়াটার সাপ্লাই নিশ্চিত করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি মাথায় রেখে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা ওয়াসা সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে নির্ভরতা কমিয়ে শতকরা ৭০ ভাগ ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে এবং বাকি ৩০ ভাগ ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সরবরাহের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সায়েদাবাদ ফেজ-২-এর পরবর্তী সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-৩ সে পরিকল্পনারই অংশ। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে রাজধানীর পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এতে ঢাকা মহানগরী মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সঙ্কট দিন দিন বেড়েই চলেছে। ওয়াসার পাম্পগুলোতে পানি উৎপাদন অনেক কমে গিয়েছিল। 
ওয়াসার বাইরের এলাকাগুলোতেও রয়েছে কমপক্ষে ৫ হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এগুলোরও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে রাজধানীর ওপর। ভূগর্ভ থেকে ক্রমাগত পানি ওঠানোর ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। জলাধার, খাল ভরাট করে ফেলায় ভূগর্ভে পানি পুনরায় ফিরে যেতে পারছে না। কমছে ওয়াসার গভীর নলকূপগুলোর উত্তোলন ক্ষমতা। তৈরি করছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা। ভবন দেবে যাওয়া, ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। 
ওয়াসার এমডি বলেন, কোনভাবেই ভূগর্ভের পানি ব্যবহার আর বাড়ানো যাবে না। বরং কমিয়ে আনতে হবে। ঢাকাকে বাঁচাতে বর্তমান অবস্থা পুরোপুরি উল্টে দিতে হবে। বর্তমানে মাত্র ১৩ শতাংশ পানি ভূ-উপরিভাগ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি ৮৭ শতাংশ পানির উৎস হচ্ছে মাটির নিচে। ভূ-উপরিভাগের পানির ব্যবহার করতে হবে ৮৭ শতাংশ। এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকপ্পনা নেয়া হয়েছে। এক দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে গুরুত্ব অনুসারে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও বসানো হবে।