এমডিজি অর্জনে অভাবনীয় সাফল্য ॥ এ বছরেই পূরণ ॥ দারিদ্র্য মোচন টার্গেট

০ আট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে বাংলাদেশ
০ দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় সাফল্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
০ দারিদ্র্য সীমা ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ
 
এম শাহজাহান ॥ এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আগামী বছর শেষ নাগাদ বা ২০১৫ সালের মধ্যেই এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায় সরকার। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবে বাংলাদেশ। 
জানা গেছে, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এমডিজি লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আছে। লক্ষ্যগুলো অর্জনে ইতোমধ্যে নয়টি সূচকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আরও ১০টি সূচকে অর্জন লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি রয়েছে। এ সাফল্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা চলতি বছরের মধ্যে পূরণ হবে বলে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। আন্তর্জাতিক এ ঋণদাতা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সাল নাগাদ তা কমিয়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে গত এক দশকের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্ব ব্যাংক মনে করছে, নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে বাংলাদেশ। 
বাংলাদেশ পোভার্টি এ্যাসেসমেন্ট শীর্ষক এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংক এ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে। ২০০০ সালে যেখানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৩০ লাখ, ২০০৫ সালে তা কমে সাড়ে ৫ কোটি এবং ২০১০ সালে তা আরো কমে ৪ কোটি ৭০ লাখে নেমে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এ দুটো লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যমতে (বিবিএস) দেশের দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশে, যা ২০১০ সালে ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ৩০ জুন পর্যন্ত এক হিসেবে এ সময়ে চরম দারিদ্র্য হার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে। 
এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব নজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি উঠে এসেছে হাউজ হোল্ড ইনকাম এন্ড এক্সপেনডিচার সার্ভেতে (হেইজ)। এই জরিপে খানার আয়-ব্যয়, ভোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ জরিপের মাধ্যমে সংগৃহীত খানার ভোগ ব্যয় তথ্য ভোক্তার মূল্যসূচক এর ওয়েট নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয় যা দেশের মূল্যস্ফীতি পরিমাপে সাহায্য করে এবং এ তথ্য ব্যয়ভিত্তিক মোট দেশজ উৎপাদন হিসাব নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রধানত দুটি কারণে বাংলাদেশ এই সফলতা অর্জন করেছে। এর একটি হলো-মজুরি বৃদ্ধি। সরকারী-বেসরকারী সব ক্ষেত্রেই শ্রমের মজুরি বেড়েছে গত এক দশকে। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে এসে নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা কমে যাওয়াও এই সাফল্যের আরও একটি কারণ। আগে যে পরিবার মাত্র একজন লোকের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই পরিবারে এখন উপার্জনক্ষম লোকের সংখ্যা একাধিক হয়েছে। গত ২০০০ সালে দেশের মোট দরিদ্র মানুষের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুত সুবিধা পেত। দশ বছর পর ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এখন এ সংখ্যা অনেক বেশি। 
দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ॥ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আগামী ২০২১ সাল নাগাদ দারিদ্র্যের অনুপাত ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এমডিজি অর্জনের প্রথম ধাপ পূরণে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশ পুরস্কৃত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়েছে। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের বিশেষ ভূমিকার স্বীকৃতি প্রদান করতে পেরে এফএও সম্মানিত বোধ করছে। ৩৮টি দেশ ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারণ করা মানদ- অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই মানদ- আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়াও জাতিসংঘের অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। এর আগে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে এমডিজি-৪ অর্জনে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রার এমডিজি-২-এর ক্ষেত্রে ২০১১ সালের মধ্যেই প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে প্রাইমারি স্কুলে পাঠানো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এমডিজি-৩ অর্জনের পথে আছে বাংলাদেশ। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে এমডিজি-৫ আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সফল হবে বলে গত বছর এক ঘোষণায় আশা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও পুরস্কার ॥ ১৩ বছর আগে ২০০০ সালে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ সম্মেলনে উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় যা, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। আগামী ২০১৫ সালের মধ্যে জাতিসংঘের সদস্য সব দেশ এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে একমত হয়। এগুলো হচ্ছে-চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বিমোচন অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনা, বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে আনা, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এইডস-ম্যালেরিয়া দূর করা, পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। সেই সময় জাতিসংঘের ১৮৯টি দেশ সর্বসম্মতিক্রমে এ ঘোষণা গ্রহণ করে। 
যদিও ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের মডেল হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ইউএনডিপির সর্বশেষ ২০০৮ সালের মানব সূচক উন্নয়নে গত দশ বছরে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে। ০.৫২৪ সূচক অর্জন করে ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৭তম। এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে।
এমডিজিতে আটটি লক্ষ্য আছে। প্রতিটি লক্ষ্য পূরণে এক বা একাধিক লক্ষ্যমাত্রা ও সূচক আছে। সব মিলিয়ে ২১টি লক্ষ্যমাত্রা এবং ৬০টি সূচক আছে, যা দিয়ে এমডিজি অর্জনের সাফল্য পরিমাপ করা হয়। এর মধ্যে ৩৪টি সূচকে পরিমাণগত লক্ষ্য আছে। বাংলাদেশ শুরুর কয়েকটি বছর এমডিজি অর্জনে একটু ঢিমেতালে এগুলোও বিগত চার-পাঁচ বছরে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এগিয়েছে।
এমডিজিতে দেয়া লক্ষ্যমাত্রাগুলো অধিকাংশই হয় অর্জিত হয়েছে, নয় অর্জনের পথে রয়েছে। এলডিসি তো বটেই, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনে এগিয়ে আছে। এর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যায় ২০১০ সালে। শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে অনন্য সাফল্য অর্জন করায় সেই বছর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এমডিজি এ্যাওয়ার্ড দেয়। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে গুণগতমান উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করায় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, সাউথ সাউথ নিউজ ও জাতিসংঘের আফ্রিকা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কমিশন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীকে সাউথ-সাউথ এ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। সম্প্রসারিত টিকাদানে সুফল অর্জন করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসা করে। জাতিসংঘ মহাসচিব ছাড়াও বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির রোল মডেল। যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও প্রাদুর্ভাব রোধে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের পথে আছে দেশ। 
পাঁচ বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ॥ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য সরকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়িত করা। রূপকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে চায় আওয়ামী লীগ সরকার। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কর্মক্ষম সব বেকার ও প্রচ্ছন্ন বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হচ্ছে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথমসারির উন্নত দেশগুলোর কাতারে নিয়ে যাওয়া। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে দায়িত্ব নিয়েই প্রণয়ন করে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১। 
আর ওই সময়ের মধ্যে মাথাপ্রতি গড় আয় বর্তমান ১০৪৪ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০০ ডলারে উন্নীত করা হবে। প্রবৃদ্ধির বর্তমান হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং দারিদ্র্যের হার ২৬ ভাগ থেকে নামিয়ে ১৩ শতাংশে নিয়ে আসা হবে। বিদ্যুত উৎপাদন বর্তমান ১০ হাজার মেগাওয়াট থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। শিল্পায়নের ফলে জাতীয় আয়ের হিস্যা ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তি ১৫ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্যমাত্রা এজন্য নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে দ্রুত অর্থাৎ আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা যায়।