সমুদ্র জয়- তেল-গ্যাস ব্লক পুনর্বিন্যাস করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্র জয়ের পর প্রাপ্ত বিশাল সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের তেল-গ্যাস ব্লক পুনর্বিন্যাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের নির্দেশ মেনে চলতি বছরই দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে নিজস্ব বিনিয়োগ এবং যৌথ অংশীদারিত্বে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা বলছে, অগভীর সমুদ্রে দুটি এবং গভীর সমুদ্রে ছয়টি ব্লকে এখন আর ইজারা দিতে কারো বাধা পেতে হবে না বাংলাদেশকে। সমুদ্র বিজয়ের ফলে ব্লকগুলো পুনর্বিন্যাস করে দ্রুত কাজ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিশেষ মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর বলেন, এখন অগভীর সমুদ্রে এসএস-০১ ও এসএস-০৫ এবং গভীর সমুদ্রে ডিএস-০৯, ডিএস-১৪, ডিএস-১৫, ডিএস-১৯, ডিএস-২৪, ডিএস-২৫ নম্বর ব্লকে ভারত আমাদের কোনো বাধা দিতে পারবে না। তিনি বলেন, আমরা তিন ধরনের চেষ্টা করছি- একটি দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ব্লক ইজারা দেওয়া, নিজেরাই কিছু অংশে বিনিয়োগ করা এবং যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে অভিজ্ঞ কোনো কোম্পানির সঙ্গে কাজ করা। আমরা চেষ্টা করছি চলতি বছরের মধ্যেই দরপত্র আহ্বান করতে। তবে দরপত্রের ক্ষেত্রে শর্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহী হয়।
পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এতদিন ব্লকগুলোর ওপর ভারতের আপত্তি থাকায় বাংলাদেশ চেষ্টা করেও কোনো কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বিরোধপূর্ণ এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে রাজি হয়নি। এখন আর এই সমস্যা থাকছে না। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা রায়ের চেয়েও এবারের রায়কে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মধ্যে মিয়ানমার যেসব এলাকায় বড় গ্যাসব্লক পেয়েছে বিরোধপূর্ণ ওই এলাকা বাংলাদেশের ভাগে পড়েনি। কিন্তু এবার আমাদের প্রত্যাশিত সমুদ্র বিজয় হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, এখন গভীর এবং অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে (পিএসসি) গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। মিয়ানমার এবং ভারতের মতোই গ্যাসের দাম নির্ধারণ করায়
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এই এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে সাগরের শুধু ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে কাজ করছে কনোকো ফিলিপস। ৭ নম্বরের জন্য পিএসসি করার কথা থাকলেও পরে সরে যায় কনোকো ফিলিপস। তবে এই ২ ব্লকে অনুসন্ধান চালাতেও চুক্তির অতিরিক্ত গ্যাসের দাম দাবি করছে কোম্পানিটি। এ নিয়ে সরকার দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। তবে এরমধ্যেই পিএসসি সংশোধনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও আইনগত জটিলতা থাকায় শেষ মুহূর্তে তা করাটা সম্ভব হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, মিয়ানমারের চেয়ে আমাদের এবারের সমুদ্র বিজয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। আগে কোনো
আন্তর্জাতিক কোম্পানি বিরোধপূর্ণ এসব এলাকায় কাজ করতে রাজি হয়নি। এখন যেহেতু আমাদের সীমানা নির্ধারণ হয়েছে তাই সেই সমস্যা আর থাকছে না। তিনি বলেন, সরকারের উচিত হবে যতদ্রুত সম্ভব তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা।
বিডিং রাউন্ড ২০০৮-এর পর কয়েকদফা দরপত্র আহ্বান করেও পেট্রোবাংলা বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর অংশের মোট ১২টি ব্লকের জন্য ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০১২’ আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে গভীর সমুদ্রের ৩টি ব্লকের জন্য কোনো
আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) দরপত্র দাখিল করেনি। শুধু অগভীর সাগরের ৯টি ব্লকের জন্য দর প্রস্তাব জমা পড়ে। প্রাথমিক বাছাইয়ে ৭ নম্বর ব্লকে কনোকো এবং ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে ওএনজিসিকে নির্বাচিত করা হয়। এরপর অগভীর সাগরের ৬টি ব্লকের জন্য আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে শুধু ১১ নম্বর ব্লকে স্যান্টোস ও ক্রিস এনার্জি যৌথভাবে দরপত্র দাখিল করে। এদের মধ্যে কনোকো ফিলিপস ছাড়া বাকিরা পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি সমুদ্রসীমায় ১৯টি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন হয়েছে। এতে গ্যাসের ভা-ার আবিষ্কৃত হয়েছে ২টিতে। এর মধ্যে শুধু বঙ্গোপসাগরে চট্টগ্রামের সীতাকু-ু উপকূলের কাছাকাছি সাঙ্গু ক্ষেত্রটিতে গ্যাস উৎপাদন করা গেছে।
ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিজয়ের পর যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের ভাগে এসেছে তাতে গ্যাসের বিশাল ভা-ারের অস্তিত্ব রয়েছে বলে ভূবিজ্ঞানীদের নিশ্চিত ধারণা। ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী এ বিজয়ের পর তেল-গ্যাস ব্লক পুনর্বিন্যাস করতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ফলে চলতি বছরই নতুন করে দরপত্র আহ্বান করবে বলে পেট্রোবাংলা সূত্রে জানানো হয়েছে। এদিকে, খুব সহসাই সমুদ্রসীমা নিয়ে নতুন গেজেট প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী নতুন সমুদ্রসীমায় তাদের নৌ ও বিমান টহল শুরু করে দিয়েছে। নৌবাহিনীর ৩টি যুদ্ধজাহাজকে এ এলাকায় নিয়মিত টহলদানে নিয়োজিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমার মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার, পাশাপাশি ইতঃপূর্বে মিয়ানমানের সাথে ১ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা জয় করে বাংলাদেশ। এ এলাকাটি এতই বিশাল যে, এটিকে আয়তনের দিক দিয়ে আরেকটি বাংলাদেশ বললেও অত্যুক্তি হবে না।
সমুদ্র-বিজ্ঞানী ও ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, গভীর সমুদ্রের ১০ নম্বর ব্লকের কিছু অংশ ভারত দাবি করায় ২০০৮ সালে ঐ অংশ বাদ দিয়ে
আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। যেখানে এখন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি কনোকোফিলিপস। এই কোম্পানি ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর ধারণা দিয়েছে, এখানে রয়েছে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ। আন্তর্জাতিক আদালতে রায়ের ফলে ওই ১০ নম্বর ব্লকটির অধিকার সম্পূর্ণভাবে পেয়েছে বাংলাদেশ। এতে গ্যাস প্রাপ্তির অপার সম্ভাবনার হাতছানি রয়েছে। ফলে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো আদালতের রায়ের পর ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে।
অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যেমন নতুন দুয়ার খুলে দেবে, তেমনি দেশজুড়ে যে চরম গ্যাস সংকট বিরাজমান তা অনেকাংশে লাঘব হবে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। পেট্রোবাংলা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, নতুন ওই এলাকাটিতে গত প্রায় ৪০ বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশের কেউ কাজ করতে পারেনি। ভারতের সমুদ্র বিজ্ঞানীরাও এ অংশে
তেল-গ্যাস মজুদের সম্ভাবনার কথা বহু আগে ব্যক্ত করেছেন। এতে করেই ভারত
আন্তর্জাতিক আদালতে এলাকাটি তাদের অংশ হিসেবে দাবি করে স্বপক্ষে রায় আনার ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের আদালতে ৫ বিচারকের মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক বিচারক বাদে বাকি ৪ জনই যে সম্মিলিত রায় দিয়েছেন তাতে পুরো এলাকাটি বাংলাদেশের পক্ষে এসে গেছে। এখন এর সদ্ব্যবহার করা গেলে তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ আহরণে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে বিশাল সম্ভাবনা।
উল্লেখ্য, ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রদত্ত আদালতের রায়ে ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব ব্লকে খনিজসম্পদ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি ব্লকে নিজেদের অংশ রয়েছে বলে ভারত দাবি করে আসছিল। এখন তারা ৬টি ব্লকের কিছু অংশ পেয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ বাংলাদেশের ভাগে এসেছে। সঙ্গত কারণে পেট্রোবাংলা, সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূ-তত্ত্ববিদসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আশাবাদীÑ প্রাপ্ত এ বিশাল সমুদ্র এলাকাজুড়ে রয়েছে তেল-গ্যাসসহ খনিজসম্পদের বিপুল ভা-ার।
দীর্ঘ সময় ওই এলাকায় বিদেশি কোনো কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী করা যায়নি। এর মূল কারণ ছিল বিরোধপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষিত হওয়ার কারণে। ইতঃপূর্বেকার সরকারগুলো এ নিয়ে তেমন তৎপরতা যেমন চালায়নি, তেমনি আন্তর্জাতিক আদালতে সাহস করে মামলা দায়েরের বিষয়টি ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ব্যাপারে নানা চিন্তাভাবনা করে আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের সহায়তায় এবং দেশীয় পরামর্শকদের সহযোগিতায় মামলা দায়েরের পর রায় এসেছে দেশের অনুকূলে। আর এর ফলে দেশের জন্য বিশাল তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদের অপার সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা এ নিয়ে যথাযোগ্য সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম দেখার পাশাপাশি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার।