ঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে- কানাডীয় আইনজীবী পায়াম আখভান

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হওয়ায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উৎসাহিত হবে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিশাল প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা মামলায় ভারত ছোট একটি অংশ পেলেও বাংলাদেশের অর্জনকেই বড় করে দেখতে হবে। নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থায়ী সালিশী আদালতে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা মামলার অন্যতম আইনজীবী অধ্যাপক পায়াম আখভান জনকণ্ঠকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে সমুদ্র মামলার রায় আমাদের জন্য একটি স্মরণীয় আইনী বিজয়। 
কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের অধ্যাপক পায়াম আখভান হেগের স্থায়ী সালিশী আদালতে (পিসিএ) বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে আইনী লড়াই করেছেন। কানাডা থেকে তিনি জনকণ্ঠকে দুই দফায় ই-মেইলে এই সাক্ষাতকার দেন। 
সমুদ্রসীমা মামলায় জয়ের পরে বাংলাদেশের এখন প্রথমে কি করা উচিত- এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক পায়াম আখভান বলেন, সমুদ্রসীমা মামলা নিষ্পত্তির পরে এখন বাংলাদেশের উচিত হবে সমুদ্রসম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা, বিশেষ করে সমুদ্রতলের প্রাকৃতিক তেল-গ্যাস ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের জ্বালানি শক্তির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। আর সেটা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলবে। বঙ্গোপসাগর থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে। 
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে পায়াম আখভান বলেন, দক্ষিণ তালপট্টি এক সময় সাগরের বুকে সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এই দ্বীপটির এখন কোন অস্তিত্ব নেই। এখন সেটা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মামলার রায়ে ভারত ছোট একটি অংশ পেলেও বাংলাদেশের বিশাল অর্জনকেই বড় করে দেখতে হবে। 
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই আইনজীবী বলেন, বিশ্বের কোন সমুদ্রসীমা মামলার রায় শতভাগ কোন একটি দেশের পক্ষে যায়নি। এ ক্ষেত্রে কোন মামলায় একতরফা রায়ও দেয়া হয়নি। আদালত সব দিক বিচার বিবেচনা করে রায় দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সে কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটারের বিরোধ থাকলেও বাংলাদেশ পেয়েছে ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার। আর ভারতের সঙ্গে ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার নিয়ে বিরোধ থাকলেও বাংলাদেশ পেয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার। এভাবে দেখবেন কোন দেশই তাদের পক্ষে রায় শতভাগ পায় না। তবে ভারতের সঙ্গে সমুদ্র মামলার রায় আমাদের জন্য একটি স্মরণীয় আইনী বিজয়। 
সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ থেকে অনেক আগেই উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল কি নাÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক পায়াম আখভান বলেন, এটি আমার জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন। আসলে এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি না করতে পারলে বাংলাদেশ যথাযথভাবে সমুদ্র এলাকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হতো। তবে এখন এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে, মামলা নিষ্পত্তির পরে বাংলাদেশ তার সমুদ্র এলাকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দুয়ার খুলেছে। সে কারণে এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও দুয়ার খুলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 
এক প্রশ্নের উত্তরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো অধ্যাপক পায়াম আখভান বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে যথাযথভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ দুই শ’ নটিক্যাল মাইল এলাকার অধিকার হারাত। তবে বাংলাদেশ আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সফল হয়েছে। সে কারণেই সমুদ্রে অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে বলে তিনি মনে করেন। 
ড. পায়াম আখভান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি না হলে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতো না। তবে এখন এই সমস্যা সমাধানের ফলে বড় বিনিয়োগকারী উৎসাহিত হবে, বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে বলে তিনি মনে করেন। 
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা মামলা নিষ্পত্তি হয়। আর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার নিষ্পত্তি হয় ৭ জুলাই। উভয় মামলার রায়ে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ।

সূত্র