আমে ভাগ্য ফিরেছে লাখো মানুষের

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট উপজেলার বিশ্বনাথপুরের রবিউল ইসলাম বছর বিশেক আগে মাত্র দুই হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে আমের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এর পর থেকেই চলছে তাঁর আমের ব্যবসা। লাভ হয়েছে, ব্যবসাও বাড়িয়েছেন। এখন তাঁর পঁুজি ২০ লাখ টাকারও বেশি। আম বিক্রি করেই বানিয়েছেন পাকা বাড়ি। রবিউলের ভাষায়, ‘আমই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’
অল্প পঁুজি দিয়ে আমের ব্যবসা শুরু করে এখন কোটি টাকার ব্যবসা করেন—কানসাটজুড়ে এমন ব্যবসায়ী অনেক মিলবে। রবিউল ইসলাম তেমনি একজন। এই রবিউল ইসলামরা আম-বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য যেমন ফিরিয়েছেন, তেমনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে গড়ে তুলেছেন এক ধরনের আমের অর্থনীতি। আর আমকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতির আকার প্রতিবছরই বাড়ছে।
সারা দেশে ঠিক কত টাকার আম-বাণিজ্য হয়, এর কোনো সঠিক তথ্য ব্যবসায়ীদের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হওয়ার আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ফরমালিন আতঙ্কে এ বছর কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য না হওয়ার আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। তিন-চার বছর আগেও আমকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা।
শুধু তা-ই নয়, আমবাগানে কর্মরত ব্যক্তি, আম পরিবহন, খুচরা পর্যায়ে বিক্রি মিলিয়ে দেশে কর্মসংস্থান হয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষের। অন্যদিকে, আম প্রক্রিয়াজাত করে ম্যাংগো ড্রিংকস ও আচার-চাটনির মতো পণ্যও তৈরি করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে বেশ। গত অর্থবছরের রপ্তানি ছিল ১১৫ কোটি টাকার। এই আম প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গেও যুক্ত আছে আনুমানিক আরও অর্ধলাখ মানুষ।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাপী আমের উৎপাদনের একটি তথ্য প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত বছর নয় লাখ ৪৫ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান নবম। আর বিশ্বে আম উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশ হচ্ছে ভারত। দেশটিতে আম উৎপাদিত হয় এক কোটি ৫৫ লাখ টন।
দেশে অর্ধশতাধিক প্রজাতির আম উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাত, হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ ও বোম্বাই রয়েছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড: দেশে এ বছর কত লাখ টন আম উৎপাদিত হয়েছে সে তথ্য পেতে আরও সময় লাগবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, আমের উৎপাদন নয় লাখ টনের আশপাশে থাকবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা, এই জেলায় এবার দুই লাখ টনের সামান্য বেশি আম উৎপন্ন হতে পারে। এই আম বেচাকেনা হলে টাকার অঙ্কে তা হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে অন্তত তিন লাখ টন আম উৎপন্ন হয়। এ থেকে আয় হয় আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছোট-বড় ৩০টি আমের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে বড় বাজার চারটি কানসাট আম বাজার, ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশন বাজার, রহনপুর রেলস্টেশন আম বাজার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরঘাট আম বাজার। কানসাটের বাজারটি দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার। এই বাজারে আমের আড়ত আছে ৩৫০টি।
কানসাট আম আড়তদার সমিতির নেতারা বলছেন, বাগানমালিকদের কাছ থেকে আম আড়তে আসার পর সেগুলো চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে বেশির ভাগ আম যাচ্ছে ঢাকায়। আম পরিবহনের জন্য ট্রাক ড্রাইভার ও তাঁর সহকারীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বড় ও মাঝারি আকারের ট্রাকের পাশাপাশি

ছোট ট্রাকেও ঢাকায় প্রচুর আম যাচ্ছে।
কৃষিবিদেরা বলছেন, আমকে ঘিরে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, ভিটামিন ও হরমোন জাতীয় নানা রাসায়নিকের ব্যবসা হয় আনুমানিক ১০০ কোটি টাকার।
এ ছাড়া আমের ঝুড়ি, ডালি, চট, পুরোনো খবরের কাগজ, কাগজের কার্টুনের ব্যবসাও বেশ হয়। আবার আম বাজারগুলোর আশপাশের হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসাও জমজমাট। আমগাছে স্প্রে, গাছ থেকে আম পাড়া, ওজন করা, ঝুড়িতে আম সাজিয়ে চট দিয়ে সেলাই করা, আম পরিবহন ও পাহারা দেওয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কাজে লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের এই কাজ চলে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস।
আম ব্যবসায়ীরা এই মৌসুমের আয় দিয়ে সারা বছর চলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য ব্যবসায়ী আম-বাণিজ্য দিয়েই নিজেদের ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এমনই আরেকজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম। তিনি জানালেন, ‘১৮ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম ব্যবসা। এখন আমার পঁুজি ৩০ লাখ টাকা। এর বাইরে ১১-১২ লাখ টাকা দিয়ে বাড়িও নির্মাণ করেছি।’
ফরমালিন আতঙ্ক: আমে ফরমালিনের অস্তিত্ব পেয়ে সম্প্রতি সারা দেশে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিপুল পরিমাণ আম ধ্বংস করেছে। বিভিন্ন স্থানের মহাসড়কেও ট্রাকে করে পরিবহন হওয়ার সময় আম নষ্ট করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০ ট্রাক আম নষ্ট করা হয়েছে। এই আমের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা।
এই চেম্বারের সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিপক্ব হওয়ার আগে বিভিন্ন স্থানের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কিছু আমে ফরমালিন মিশিয়ে বাজারজাত করেছিলেন। সেটার ঘানি আমাদের টানতে হচ্ছে। এখন আম পেকেছে। এই আম শতভাগ ফরমালিনমুক্ত। আমাদের কাছে এখনো ৬০০-৭০০ কোটি টাকার আম আছে। কিন্তু এই আম আমরা বাজারজাত করতে পারছি না।’
কানসাট আম আড়তদার সমিতির সভাপাতি আবু তালেব ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম জানান, অন্যান্য বছর এই সময় যেখানে প্রতিদিন ১০০ ট্রাকের বেশি আম ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যায়, সেখানে এখন যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম। প্রতি ট্রাকে সাত থেকে আট লাখ টাকার আম থাকে। ফরমালিন আতঙ্কেই আমের সরবরাহ কমে গেছে। ফরমালিনবিরোধী অভিযানের কারণে আমবাহী ট্রাক যাত্রাপথে হয়রানির শিকার হতে পারে—এই আশঙ্কায় অনেক বাগানমালিক গাছেই আম রেখে দিচ্ছেন।
এ অবস্থায় গতকাল বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারসহ ছয়টি ব্যবসায়ী সংগঠন চেম্বার ভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছে। ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে নেতারা আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জমায়েত ও বিক্ষোভ মিছিল করা এবং পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর পরও হয়রানি বন্ধ না হলে আগামী রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের ঘোষণাও দিয়েছে সংগঠনগুলো।
প্রক্রিয়াজাত আম রপ্তানি: শুধু যে কাঁচা কিংবা পাকা আমেরই বাণিজ্য হয়, তা নয়। আম প্রক্রিয়াজাত করে দেশে তৈরি হয় নানা ধরনের জুস-ড্রিংকস, আচার ও চাটনি, ম্যাংগো বারের মতো পণ্যও। এসব পণ্যের দেশে যেমন চাহিদা, তেমনি এর বড় একটি অংশ রপ্তানিও হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গেল ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ দেশ থেকে এক কোটি ৩১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার মূল্যের আমের জুস ও ড্রিংকস, এক লাখ ৩১ হাজার ডলারের ম্যাংগো বার, ছয় লাখ ৪০ হাজার ডলারের আচার ও চাটনি রপ্তানি হয়েছে।
এসব পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান, মালয়েশিয়া, ভারত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশ ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। সুত্র