কৈ মাছের গ্রাম

ময়মনসিংহ শাহবাজপুর গ্রাম এখন কৈ মাছের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এ গ্রামের উত্পাদিত কৈ মাছ এখন ময়মনসিংহের বিভিন্ন হাটে-বাজারে বিক্রির পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আড়তে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি এ কৈ মাছ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

মাছ উত্পাদন করে এ গ্রামবাসী ও বেকার যুবকরা যেমন লাভবান হয়েছেন, তেমনিভাবে লাভবান হচ্ছেন পোনা সরবরাহকারী ও মাছের খাদ্য সরবরাহকারীরাও। বেকার যুবকদের পাশাপাশি অনেক স্কুল/কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে কৈ মাছের চাষাবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই উপার্জন করছেন। শাহবাজপুর গ্রামের কৈ মাছের চাষের সফলতা দেখে কৃষ্ণপুর, রশিদপুর, মুদারপুর, রঘুরামপুর, আলালপুর, কামারিয়া, ফতেহপুর, হরিপুর, মোয়াজ্জেমপুর, কোদালিয়া, মেছেরা, লালমাসহ বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে কৈ মাছ চাষ। গ্রাম যেন মডেল হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের সারা জেলায়ই অন্যান্য মাছের পাশাপাশি এখন চাষ হচ্ছে কৈ মাছ। সারা দেশেরও মডেল হতে পারে শাহবাজপুর গ্রাম।

শাহবাজপুর গ্রামে ২০০৪ সালে ব্রহ্মপুত্র ফিশ ফিড কমপ্লেক্স হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী নূরুল হকের কাছ থেকে থ্রাই কৈ মাছের পোনা নিয়ে সর্বপ্রথম কৈ মাছের চাষ শুরু হয়। সর্বপ্রথম কৃষিবিদ সমীরণ দত্ত বাবুর তত্ত্বাবধানে শাহবাজপুর গ্রামের কাজিমউদ্দিন ও নাজিমউদ্দিনের কাছ থেকে ১৪ একর জমি লিজ নিয়ে ঢাকার ‘এম কে আর গ্রুপের’ প্রতিষ্ঠান ‘হামিদ ফিসারিজ’-এর আব্দুল হামিদ থ্রাই কৈ মাছের চাষ শুরু করেন। হামিদ ফিসারিজ-এর কৈ মাছের সফলতা দেখে কৃষিবিদ সমীরণ দত্তর অনুপ্রেরণায় পরবর্তী বছরই মুসলেম উদ্দিন, মাফিজুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, বেলাল হোসেন, কাশেম ব্যাপারী, হযরত আলী, নাজিমউদ্দিনসহ অনেকেই পুকুর তৈরি করে কৈ মাছের চাষ শুরু করেন। তাদের সফলতা দেখে আব্দুল জব্বার বেপারী, ওয়াহেদ আলী মেম্বার, মোহাম্মদ আলী, মিজানুর রহমান, রুস্তম আলী, জামাল বেপারী, হারুন ব্যাপারী, আব্দুল আউয়াল উজ্জল মিয়াসহ বহু গ্রামবাসী কৈ মাছের চাষে এগ্রিয়ে আসেন। বৃদ্ধি পেতে থাকে কৈ মাছের পুকুর ও চাষীর সংখ্যা। নিজেরাই নিজেদের পোনা উত্পাদন শুরু করেন। বছরের পর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে কৈ মাছের উত্পাদন। পুরো গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কৈ মাছের চাষ। গ্রামটি এখন কৈ মাছের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

শাহবাজপুর গ্রামে প্রবেশের একমাত্র রাস্তাটি একসময় কাঁচা থাকায় কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যেত। মাছ পরিবহন ও বিপণনে মারাত্মক অসুবিধা হতো। বর্ষা আসলে উত্পাদিত কৈ মাছ নিয়ে বিপাকে পড়ত এখানকার মাছ চাষিরা। রাস্তা খারাপের কারণে অনেকে মাছ চাষ ছেড়েও দিয়েছিল। ২০১২ সালে মাছ চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ‘চ্যানেল-আইয়ে’র পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ চ্যানেল আই ও বিটিভিতে সচিত্র সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি চ্যালেন আইয়ের স্টুডিতে হাজির করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানককে। এ সংবাদ দেখে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে এ গ্রামের কৈ মাছের সম্ভাবনাকে আরো বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রুত শাহবাজপুর গ্রামের আড়াই কিলো রাস্তাটি পাকা করণের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতির একবছরে মাথায় ২০১৩ সালে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে শাহবাজপুরের রাস্তা সম্পন্ন করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক শাইখ সিরাজকে সঙ্গে নিয়ে নিজে এসে এ রাস্তার উদ্বোধন করেন। রাস্তাটি পাকা হয়ে যাওয়ায় মাছ পরিবহনে এখন আর অসুবিধাি হচ্ছে না। পুুকুরপাড়েই ট্রাকভরে মাছ চাষিরা তাদের মাছ দেশের বিভিন্ন আড়তে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তাটি পাকা হওয়ার সাথে সাথে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে কৈ মাছসহ বিভিন্ন মাছের উত্পাদন। বদলে গেছে এ গ্রামের চিত্র ও জীবনযাত্রার মান। গ্রামবাসীও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছেন। গ্রামবাসীই শুধু অর্থনৈতিকভাবেই সমৃদ্ধ হয়নি। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে শত শত বেকার যুবকের। বহু যুবক নিজেই গড়ে তুলেছেন মাছের খামার। ফসল উত্পাদনের পাশাপাশি প্রতিটি বাড়িতেই পুকুরে চাষ করছেন কৈ মাছ।

কৈ মাছ চাষী মাফিদুল ইসলাম জানান, এ গ্রামের মানুষকে এখন আর মাছ কিনতে হয় না। তাদের উত্পাদিত মাছ তারা নিজেরা খাচ্ছেন এবং ময়মনসিংহসহ ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুর, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছ সরবরাহ করছেন এই শাহবাজপুর গ্রাম থেকে। প্রতিদিনই ট্রাকযোগে শত শত টন কৈ মাছ এখন বিক্রি হচ্ছে। বিগত সময় কৈ মাছের দাম কম থাকলেও এ বছর শাহবাজপুরের চাষীরা ভাল দামে কৈ মাছ বিক্রি করছেন। পুকুর পাড়েই প্রতি কেজি কৈ মাছ বিক্রি করছেন ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা এবং বিভিন্ন আড়তে প্রতি কেজি কৈ মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০শত টাকা। এ কৈ মাছ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ৩ শত টাকায়। মাফিদুল আরো জানান, থ্রাই কৈ মাছের পর এখন শুরু হয়েছে ভিয়েতনাম কৈ মাছের চাষ। সেইসাথে এ গ্রামে কৈ মাছের সাথে শিং, দেশীয় মাগুর, গোলশা মাছও চাষাবাদ শুরু হয়েছে। ভিয়েতনাম কৈ ৪/৫টি এক কেজি ওজনের হয় বলে মাফিদুল জানান।

রেনুপোনা উত্পাদনকারী ব্রহ্মপুত্র ফিস ফিট কমপ্লেক্স হ্যাচারীর স্বত্বাধিকারী নূরুল হক জানান, ২০০৪ সালে ৮ হাজার পোনা নিয়ে সমীরণ দত্ত শাহবাজপুর গ্রামের এম কে আর গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান হামিদ ফিসারিজ এর আব্দুল হামিদ থ্রাই কৈ মাছের চাষ শুরু করেন। খাবার ব্যবসায়ী ও মাছ চাষি মুসলেমউদ্দিন জানান, নিজের ও গ্রামের মানুষের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমি মাছ চাষের পাশাপাশি মাছের খাবার ব্যবসা শুরু করি। শম্ভুুগঞ্জ বাজারে ৩০/৩৫ জন মাছের খাবার ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। শাহবাজপুর গ্রামে কমপক্ষে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ টন মাছের খাবার সরবরাহ হয়।