বিনিয়োগবান্ধব নতুন মুদ্রানীতি আসছে

সঙ্কোচনমূলক মুদ্রাানীতি থেকে বের হয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধ অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য ঘোষণা করা হচ্ছে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি। এ মাসের শেষভাগে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতে পারে। ইতোমধ্যে মুদ্রানীতির কৌশল চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নেয়া হয়েছে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতামত। সব মতামতই সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির পক্ষে বলে জানা গেছে।
তবে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিতে যাবে না। বরং এক ধরনের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করবে, যাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও তাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়। গত কয়েক বছর ধরেই সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঋণ বা নগদ অর্থের প্রবাহের লাগাম কঠোরভাবে ধরে রেখেছে। কয়েক দফা আমানতের বিপরীতে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ বা সিআরআরের হার বাড়িয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে তুলে নেয়া হয়েছে বাড়তি টাকা। এতে ঋণ ও বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে খুুব বেশি মনোযোগ দেয়নি।
জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এজন্য এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাড়ানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৈনন্দিন ও সাপ্তাহিক ভিত্তিতে রক্ষিত নগদ জমার হার। পাশাপাশি বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আগামীর পূর্বাভাস মাথায় রেখে মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রেখে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুলাই) মুদ্রানীতি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে ব্যাপক মুদ্রার জোগানও অপরিবর্তিত রাখা হয়। অর্থাৎ চলতি মুদ্রানীতিতে ব্যাপক মুদ্রা ও বেসরকারি খাতে ঋণ জোগানের প্রবৃদ্ধি ধরা হয় যথাক্রমে ১৭ ও ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ধরা হয় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর সরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২২ দশমিক ৯০ শতাংশ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে (জুলাই-মে পর্যন্ত) বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ সময় রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর মুদ্রার ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এ ছাড়া সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে মুদ্রানীতি প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, আগামী মুদ্রানীতি প্রণয়নের কাজ অনেকাংশে শেষ হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি সহায়ক উৎপাদনশীল খাতে অর্থ প্রবাহে শিথিলতা থাকলেও সম্পদের মূল্য যাতে ফুলে-ফেঁপে না ওঠে, সেজন্য সংরক্ষণ নীতি থাকছে। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ জোগান নিরুৎসাহিত করার ঘোষণাও থাকবে। এ বিবেচনায় নতুন মুদ্রানীতির ভঙ্গিকে ভারসাম্যপূর্ণ বলা যায় বলে তিনি মনে করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এবার সম্প্রসারণমূলক বাজেট দেয়া হয়েছে। কাজেই মুদ্রানীতি প্রণয়নে বিষয়টি বিবেচনায় আসবে। তবে মুদ্রানীতির ভঙ্গিমা এবার যেন সংযত বা সঙ্কোচনমূলক না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিনিয়োগ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ঋণের জোগান যেন উৎপাদনশীল খাতে হয়, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এমন মুদ্রানীতি দেয়া হবে, যেখানে বিনিয়োগ যেমন উৎসাহিত হবে, তেমনি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনারও সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানান কারণে বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতির সূচকটিও এখন বাড়তির দিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন মূল্যস্ফীতির একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তবে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি কোনোভাবেই অর্জন সম্ভব নয়। নতুন মুদ্রানীতিতে এ বিষয়টিও তুলে ধরা হবে এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা দেয়ার প্রচেষ্টা থাকবে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, এখনই বলার মতো কিছু হয়নি। নানান পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় চলছে। তবে মুদ্রানীতি অবশ্যই বিনিয়োগবান্ধব হবে।