বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা বেড়ে গেলো ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার

নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ)রায়ে নতুন ১৯ হাজার চারশ’ ৬৭ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক ভূখণ্ড পেল বাংলাদেশ। মহীসোপানে চিত্রিত হলো নতুন মানচিত্র। দীর্ঘ ৪ বছর ৯ মাস ধরে এই আইনি লড়াই লড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে এবং এই লড়াইয়ের শেষ রায় যেন সকল বাংলাদেশীদের মুখে হাসি ফোটালো।আদালতের দেয়া এই রায়ে আপিলের কোন সুযোগ রাখা হয়নি।

আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২ টায় পিসিএ’র সেক্রেটারি জেনারেল হুগো এইচ সিবলেজ বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রতিনিধি দলের কাছে রায় হস্তান্তর করেন।নেদারল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশ এবং ভারতের রাষ্ট্রদূত এই রায়ের কপি গ্রহণ।বাংলাদেশের পক্ষে নেন শেখ মোহাম্মদ বেলাল এবং ভারতের পক্ষে নেন রাজেশ নন্দন প্রসাদ।

সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধের প্রধান বিষয় হলো দুই দেশের জলসীমা শুরুর স্থান নির্ধারণ। এছাড়া ভূমিরেখার মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। ভূমির মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রির সোজা রেখা দাবি করে বাংলাদেশ। তবে ভারতের যুক্তি ছিল সমুদ্রতট বিবেচনায় এ রেখা হবে ১৬২ ডিগ্রি।তবে আদালতের রায়ে ভূমির মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৭৭.৩ ডিগ্রি রেখা টানা হয়েছে। যা বাংলাদেশের দাবির খুব কাছাকাছি।বাংলাদেশ এবং ভারত পৃথক পৃথক পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে এই  রেখা টানার ব্যাপারটি সুরাহা করতে চেয়েছিল কিন্তু আদালত তার নিজস্ব সমতার ভিত্তিতে এই রায় দেয়।
বিরোধ নিষ্পত্তির আগে বাংলাদেশ অংশের ১০টি তেল-গ্যাস ব্লক নিজেদের বলে দাবি ছিলো ভারতের। তবে রায়ের মধ্য দিয়ে এ দশটি ব্লকই বাংলাদেশ পেয়েছে। তবে ১০ ব্লকের ০১,০৫, ০৯, ১৪, ১৯ এবং ২৪ নম্বর ব্লকের অংশ বিশেষ পেয়েছে ভারত। এ রায়ের মাধ্যমে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও খণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্টা হয়েছে বাংলাদেশের।

পিসিএ’র বিচারক ছিলেন পাঁচজন। এদের মধ্যে আদালতের প্রধান জার্মানির প্রফেসর ড. রুডিগার উলফ্রাম। অন্যরা হলেন, ফ্রান্সের জ্যাঁ-পিয়েরে কট, ঘানার থমাস এ ম্যানসা, ভারতের ড. প্রেমারাজ শ্রীনিবাস রাও, অস্ট্রেলিয়ার প্রফেসর আইভান শীয়ারার। প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারত একজন করে বিচারক মনোনীত করে থাকে। বাংলাদেশের মনোনীত বিচারক ছিলেন, ঘানার থমাস এ ম্যানসা। তবে ভারতের মনোনীত বিচারক ড. প্রেমারাজ শ্রীনিবাস রাও এ রায়ের সঙ্গে কিছু অংশে দ্বিমত পোষণ করেন।

মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ রায়ের ফলাফল আনুষ্ঠানিককভাবে ঘোষণা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মুস্তাফা কামাল, মেরিটাইম বিষয়ক সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশিদ আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রায়ের ফলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশী টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্রগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সকল ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য  ট্রাইব্যুনাল বিরোধপূর্ণ আনুমানিক ২৫,৬০২ বর্গ কিলোমিটার  সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯,৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার  সমুদ্র  এলাকা বাংলাদেশকে প্রদান করেছে’।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশা করেন, সমুদ্রসীমা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এই অতিরিক্ত সমুদ্র এলাকার সম্পদ ব্যবহার করে অনেক উপকৃত হবে এবং এইসব সম্পদ ব্যবহারে অনেক সচেতন হবে।তিনি আশা করেন বাংলাদেশের নতুন এই অর্জন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও অনেক অবদান রাখবে।