ন্যায্যতা ও বন্ধুত্বের জয়

কৌশলগত দিক দিয়ে রায়ের আগেই জয়ী হয়েছিল বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরে আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে ভারতকে নিতে পেরেছে এ দেশ। পাকিস্তান অবশ্য পেরেছিল, তবে তা দুই দেশের মধ্যে থাকা ইন্দুজ পানি চুক্তির একটি ধারাকে কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশটির এমন কোনো চুক্তি নেই, যার ভিত্তিতে সমস্যা নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে যাওয়া যায়। এর পরও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশ ভারতকে নেদারল্যান্ডসের হেগে স্থায়ী সালিসি আদালতে (পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন, সংক্ষেপে পিসিএ) নিতে পেরেছে। গতকাল সোমবার দুপুর ২টার দিকে (নেদারল্যান্ডস সময় সকাল ১০টায়) বিবদমান দুই পক্ষ আদালতের রায় পেয়েছে। নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ ও ভারতের রাষ্ট্রদূতরা ওই রায়ের কপি গ্রহণ করেছেন।
এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধের শান্তিপূর্ণ ও আইনি সমাধান হয়েছে, নিশ্চিত হয়েছে দুই দেশের নতুন সমুদ্রসীমা। রায়টি বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গেও নিশ্চিত হলো ন্যায্য অধিকার, জয় হলো বন্ধুত্বের।
জানা গেছে, রায় হাতে পাওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত তা আনুষ্ঠানিকভাবে না জানাতে আদালতের অনুরোধ রয়েছে। উভয় পক্ষের কাছে রায় পৌঁছানো নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ। ওই ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর আজ মঙ্গলবার দুপুরেই ঢাকায় তা আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করে জানানো হতে পারে।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী রায় পাওয়ার কথা সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, রায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আজ তা সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে।
ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা : ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ ছিল বঙ্গোপসাগরের ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে। এ বিরোধের মূল বিষয় হলো দুই দেশের জলসীমা শুরু হবে কোথা থেকে তা নির্ধারণ করা। এ ছাড়া ভূমিরেখার মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়েও জটিলতা ছিল। ভারতের যুক্তি হলো, সমদূরত্বের (ইকুইডিসট্যান্স) ভিত্তিতে রেখা টানতে হবে। বাংলাদেশ এর বিরোধিতা করে ন্যায্যতার (ইকুইটি) ভিত্তিতে রেখা টানার পক্ষে অবস্থান নেয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় রেখা অবতল আকৃতির হওয়ায় বাংলাদেশ ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারণে যুক্তি উপস্থাপন করে। এর আগে ২০১২ সালে সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবার ভারতের সঙ্গেও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বড় অংশ বাংলাদেশের পাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মিয়ানমার ও ভারত সমদূরত্বের ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা দাবি করায় বাংলাদেশের সাগর এলাকা সীমিত হয়ে পড়েছিল মাত্র ১৩০ নটিক্যাল মাইলে। তবে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলার রায়ে ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক এলাকা এবং তদূর্ধ্ব মহীসোপান এলাকায় বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম অধিকার সুনিশ্চিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে মামলায়ও বাংলাদেশ ইতিবাচক ফল প্রত্যাশা করে লড়েছে। স্থায়ী সালিসি আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদের আর্টিকেল ২৮৭ ও অ্যানেক্স আট, আর্টিকেল এক অনুযায়ী স্থায়ী সালিসি আদালতের শরণাপন্ন হয়। আদালতে প্রফেসর ড. রুডিগার ওলফ্রুমের নেতৃত্বে আরো চারজন বিচারক রয়েছেন। মামলায় বাংলাদেশের এজেন্ট ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম বাংলাদেশের পক্ষে মামলায় ডেপুটি এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের পক্ষে কৌঁসুলি হিসেবে ছিলেন লন্ডনের ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রফেসর জেমস ক্রোফোর্ড এসসি, প্রফেসর ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি, এসেক্স কোর্ট চেম্বার্সের প্রফেসর অ্যালান বয়েল, মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পায়াম আকাভান, ওয়াশিংটন ডিসির ফলি হগ এলএলপির পল এস রিখলার ও লরেন্স মার্টিন।
অন্যদিকে মামলায় ভারতের পক্ষে এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও আইনি উপদেষ্টা ড. নিরু চাধা এবং কো-এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। ভারতের কৌঁসুলিদলে ছিলেন আর কে পি শংকরদাশ, প্যারিস ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি নানতেরে-লা ডিফেন্সের প্রফেসর অ্যালিয়ান প্যালেট, লন্ডনের স্যার মাইকেল উড, ইয়েল ল স্কুলের প্রফেসর ডাব্লিউ মিশেল রেইসম্যান।
যে কারণে মামলা : স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আলোচনা শুরু করে। তবে এতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরপর ২০০৯ সালের জুলাই, ২০১০ সালের জানুয়ারি ও মার্চ মাসে মিয়ানমারের সঙ্গে তিন দফা বৈঠক করে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের মার্চ এবং ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা নিয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের অনন্য ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আমলে নিয়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দাবি জানায়। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ভারত বাংলাদেশের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সমদূরত্বের ভিত্তিতে সীমা নির্ধারণের পক্ষে মত দেয়।
সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশ দরপত্র আহ্বান করার পর প্রতিবেশী দেশগুলো তাতে আপত্তি জানালে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস ব্লকের ১০টি ভারত এবং ১৭টি মিয়ানমার তার নিজের বলে দাবি করে। এর পরই সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন (আনক্লজ) ১৯৮২ অনুযায়ী সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে সালিসি নোটিশ পাঠায়। মিয়ানমার ও ভারত ওই নোটিশে ইতিবাচক সাড়া দেয়। পাশাপাশি আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছিল দেশগুলো।
অস্তিত্বহীন দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ : আশির দশকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে বিরোধ হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের। উভয় দেশ এই দ্বীপকে নিজের বলে দাবি করেছিল। ওই এলাকার বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা বিভাজক হাড়িয়াভাংগা নদীর মূলস্রোত যেহেতু দ্বীপের পশ্চিম ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, সেহেতু ‘নদীর মূল স্রোতধারার মধ্যরেখা নীতি’ অনুযায়ী বাংলাদেশ ওই দ্বীপটিকে নিজ দেশের অন্তর্ভুক্ত করছিল। অন্যদিকে ভারতের দাবি ছিল, নদীর মূলস্রোত পরিবর্তনশীল।
বাংলাদেশ দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা দাবি করলেও ভারত ১৯৮১ সালে সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের পতাকা ওড়ায়। তবে বর্তমানে ওই দ্বীপটির অস্তিত্ব নেই। জানা গেছে, মামলার বিচারকরা বাংলাদেশ ও ভারত থেকে আলাদাভাবে ওই স্থান পরিদর্শন করেছেন। দ্বীপের অস্তিত্ব না থাকায় এখন আর তা আদালতের রায়ে পাওয়া না পাওয়ার বিষয় নেই। তবে দ্বীপটির অস্তিত্ব থাকলে তা দুই দেশের সীমা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।