উদ্ভাবনের অসামান্য প্রচেষ্টা

প্রায় ৩৬ বছর আগে ১৯৭৮ সালে বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানী ড. আবদুস সাত্তার সৈয়দের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম ও একই বিভাগে সদ্য যোগ দেয়া তখনকার তরুণ এ লেখক একটি গবেষণায় নিয়োজিত হন যেসব ভাঙা হাড় বহুদিনেও জোড়া লাগছে না, বিদ্যুত্ চুম্বকীয় উত্তেজনা দিয়ে সে হাড় জোড়া দেয়ার চেষ্টায়। বিদেশের কিছু গবেষণা প্রবন্ধ থেকে ধারণা নিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনে লেখক একটি ইলেকট্রনিক উত্তেজক তৈরি করেন। এটি ব্যবহার করে পঙ্গু হাসপাতালে ১৬ জন রোগীর ওপর পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সফলতা আসে। এর ধারাবাহিকতায় এবং অধ্যাপক শামসুল ইসলামের দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্বে ব্রিটেনের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি গবেষণার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা লেখককে বিশাল সুযোগ এনে দেয়। নিজের হাতে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরির ইচ্ছা ও দক্ষতা তাকে শেফিল্ডের বিজ্ঞানীদের খুব কাছে নিয়ে আসে। যত্নের সঙ্গে তারা লেখকের সামনে বিভিন্ন প্রযুক্তির গোড়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন ও সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। চিকিত্সায় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে এবং লেখকের হাতে দায়িত্ব চলে আসে এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেয়ার।
গবেষণা বিষয়ে লেখকের কিছু দর্শন তরুণদের মধ্যে উদ্যম ও আগ্রহ সৃষ্টি করে এ দলের গবেষণাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। প্রথমটিই হচ্ছে সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক লক্ষ্যবিশিষ্ট গবেষণা। গবেষণার এমন লক্ষ্য থাকতে হবে, যা সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে এ দেশের বঞ্চিত দরিদ্র জনগণের জীবনের মানোন্নয়নে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত. এমন বিষয় নিয়ে গবেষণা করা, যা নিজের হাতে তৈরি করা যন্ত্রপাতি দিয়ে করা যায়। বিদেশ থেকে আনা দামি যন্ত্রপাতিনির্ভর যেন না হয়। ইলেকট্রনিকস ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রযুক্তিতে লেখকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে চলতে সাহায্য করেছে।
১৯৭৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রায় ৮০ জনেরও বেশি ছাত্রকে এমএসসি ও পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত করে তাদের সাহায্যে লেখক তার গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যান ধীরে ধীরে। কয়েকটি নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কারও এসে যায় এর মধ্য দিয়ে, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বীকৃত হয়েছে এবং কয়েকটি উন্নত দেশেও এ আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। আমাদের ডিজাইন করা কয়েকটি জটিল চিকিত্সাযন্ত্র দেশে ব্যবহার হচ্ছে কয়েক দশক ধরে। একটি যন্ত্র দেশের বাইরেও সফলভাবে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় চার বছর ধরে। ২০০৮ সালে লেখকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বায়োমেডিকেল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ’ নামে একটি নতুন বিভাগের জন্ম হয়। গবেষণায় জোর দেয়ার জন্য শুরুতে কেবল পিএইচডি ও এমফিল গবেষণার ছাত্র নেয়া হয়। দেশে পূর্ণকালীন পিএইচডি ছাত্র পাওয়ায় কিছুটা সমস্যা থাকলেও এ বিভাগের ঐকান্তিকতা, কাজের উদ্দেশ্য, মান ও পরিধি তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করে ভালোভাবেই। দশজন পিএইচডি ও এমফিল ছাত্র পূর্ণকালীন গবেষণা করছেন এ বিভাগে। আরো কয়েকজন তরুণ গবেষণা করছেন বিভিন্ন প্রকল্পে। গত বছর থেকে এমএস কোর্স চালু হয়েছে সীমিতসংখ্যক ছাত্র নিয়ে। ধীরে ধীরে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। এসব তরুণের মধ্যে লেখক তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছেন। এ বিভাগের যেসব গবেষণার ফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য মোটামুটি প্রস্তুত, তার কিছু সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এ প্রবন্ধে তুলে ধরা হচ্ছে।
১. কম্পিউটারাইজড স্নায়বিক সংকেত পরিবহন পরিমাপযন্ত্র। স্নায়বিক রোগ নির্ণয়ে স্নায়ুর সংকেতের গতিবেগ পরিমাপ খুবই জরুরি। ১৯৮৮ সালে শেফিল্ডের বিজ্ঞানীদের সহায়তায় লেখকের তৈরি এ যন্ত্র সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটারভিত্তিক যন্ত্র। আবার এর ব্যবহারে বাংলাদেশে প্রথম স্নায়বিক সংকেত পরিবহন পরিমাপ রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থাও করেন সে সময় থেকেই। পরবর্তী সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নতুন পরিমাপ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে একটি স্নায়ুর ভেতরের অনেক স্নায়ুতন্তুর গতিবেগের বিস্তার নির্ণয় করা যাচ্ছে। আবার এ পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহারে স্নায়বিক কারণজনিত ঘাড়ের ও কোমরের ব্যথা (স্পন্ডিলোসিস) খুব প্রাথমিক পর্যায়েই ধরার পদ্ধতিও আবিষ্কার করেন তারা। এ আবিষ্কার ব্যবহার করে সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যেও ইদানীং গবেষণা শুরু হয়েছে।
২. কম্পিউটারাইজড ইসিজি যন্ত্র। ইউএসবি পোর্টের মাধ্যমে এ যন্ত্র যে কোনো কম্পিউটারে সংযুক্ত করে ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার স্থাপন করলেই তৈরি হয়ে যায় একটি পূর্ণাঙ্গ ইসিজি যন্ত্র। বিভাগের সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিজাইনে এর প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক সার্কিট ও সফটওয়্যার উদ্ভাবন করা হয়েছে। মাত্র ৭ ইঞ্চি আকারের এ যন্ত্র কম্পিউটার থেকেই শক্তি নেয়, কোনো আলাদা ব্যাটারি প্রয়োজন হয় না। মাউসের ক্লিকের মাধ্যমে কম্পিউটারের পর্দায় প্রয়োজনীয় ১২টি ইসিজি চিত্র ভেসে আসে। আর সাধারণ কাগজেই এসব চিত্র প্রিন্ট করে নেয়া যায়। সাধারণ ইসিজি যন্ত্রের মতো কোনো বিশেষ কাগজের প্রয়োজন হয় না। আবার সংকেতগুলোকে সঙ্গে সঙ্গেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেয়া যায় টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিত্সার জন্য। ইসিজিসহ রোগীর সব তথ্য হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করা যায় ভবিষ্যতে দেখার জন্য। এ বিভাগের তৈরি ইসিজি যন্ত্রের রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা সম্পর্কে ইদানীং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা পরীক্ষা করে সনদ দিয়েছেন।
৩. শ্বাস-প্রশ্বাস পরিমাপের জন্য কম্পিউটারাইজড ইলেকট্রিক্যাল ইমপিড্যান্স যন্ত্র। শরীরের ভেতর নিরাপদ মাত্রায় খুবই সামান্য বৈদ্যুতিক প্রবাহ পরিচালনা করে তার বাধার পরিমাণ পরিমাপ করাই এ পদ্ধতির মূল সূত্র। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে ফুসফুসের ইলেট্রিক্যাল ইমপিড্যান্সের পরিবর্তন হয়, যা ধরা পড়ে এ পরিমাপে। আমাদের একটি উদ্ভাবন, যার নাম দিয়েছি ‘ফোকাসড ইমপিড্যান্স মেথড’। এটি ব্যবহার করে খুব সহজে ও অল্প খরচে নির্দিষ্ট একটি ছোট অঞ্চলের ইমপিড্যান্স পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে। একটি ইলেকট্রোড প্যাড বুকে বা পিঠে স্পর্শ করে আমাদের তৈরি যন্ত্রে পরিমাপ করলেই কম্পিউটারের পর্দায় শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের পরিবর্তনের গ্রাফচিত্র ফুটে ওঠে। সেটিকে বিশ্লেষণ করে শ্বাসের হারও বের করা যায়। ফোকাসড ইমপিড্যান্স মেথডের সম্ভাবনা ব্যাপক। ফুসফুসে পানি জমেছে কিনা, নিউমোনিয়া হয়েছে কিনা, স্তনের টিউমার ক্যানসারযুক্ত কিনা, তা নির্ণয়ে আমাদের গবেষণাগারে কাজ শুরু হয়েছে। ফোকাসড ইমপিড্যান্স মেথডটি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও কোরিয়ায় এ পদ্ধতি নিয়ে এরই মধ্যে গবেষণা শুরু হয়েছে।
৪. যেসব গ্রামে চিকিত্সক নেই, সেখানে চিকিত্সকের সেবা পৌঁছে দেয় নিজেদের তৈরি রোগ নির্ণয় যন্ত্রসহ টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা। ইন্টারনেট ও সেলফোনের মাধ্যমে টেলিমেডিসিনের চেষ্টা অনেকেই করছেন, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিত্সক ও রোগীর মধ্যে কেবল ছবি ও কথা আদান-প্রদান হয়। রোগ নির্ণয় যন্ত্রের মাধ্যমে তথ্য পাঠানোর জন্য যেসব বিদেশী যন্ত্র পাওয়া যায়, তার দাম অনেক বেশি। আর হাজার হাজার গ্রামভিত্তিক কেন্দ্রে তা দিতে গেলে খরচ কতটা হবে, বলাই বাহুল্য। তাছাড়া আমাদের আবহাওয়া ও বিদ্যুত্ লাইনের অস্বাভাবিক অবস্থায় এসব যন্ত্র খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। একবার নষ্ট হলে তা সারানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্য আমাদের বিভাগ নিজস্ব ডিজাইনে বা সহজে পাওয়া যায়, এমন যন্ত্রে কিছু পরিবর্তন এনে কয়েকটি প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাসহ একটি টেলিমেডিসিন ব্যবস্থা উন্নয়ন করেছে। ইসিজি ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরিমাপের যন্ত্র দুটোর কথা আগেই বলা হয়েছে। এছাড়া তৈরি করা হয়েছে ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কাপ, গ্রাম-কেন্দ্রে রোগীর গায়ে টেকনিশিয়ান তা ধরবে আর শহরে বসে এয়ারফোন কানে দিয়ে চিকিত্সক সঙ্গে সঙ্গেই সে শব্দ শুনতে পারবেন। উপজেলা হেলথ কমেপ্লেক্সে মাইক্রোস্কোপ টেকনিশিয়ান আছেন, এক্স-রে মেশিন ও টেকনিশিয়ান আছেন, কিন্তু তা দেখে রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। এজন্য বিদেশী মাইক্রোস্কোপে ডিজিটাল ক্যামেরা লাগিয়ে এবং এক্স-রে ভিউবক্সের ওপরও ডিজিটাল ক্যামেরা লাগিয়ে তার ছবি চিকিত্সকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার চিকিত্সক যেন সহজে প্রেসক্রিপশন তৈরি করেন, তা গ্রাম-কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিতে পারে, সে জন্য বিভিন্ন রোগের লক্ষণ, সম্ভাব্য পরামর্শ ও দেশে পাওয়া যায়, এমন ওষুধের তথ্যভাণ্ডারসহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। গোটা টেলিমেডিসিন সিস্টেম পরিচালনার জন্যও সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু করতে স্বল্পপরিসরে উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়েছে।
৫. ডায়াবেটিক রোগীদের পায়ের চাপের বিস্তার পরিমাপের জন্য কম্পিউটারাইজড ডায়নামিক পেডোগ্রাফ যন্ত্র। একজন সুস্থ মানুষ তার পায়ের বা জুতার কোনো সমস্যার কারণে ব্যথা হলে তা টের পেয়ে দূর করার ব্যবস্থা নেন। কিন্তু স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে ডায়াবেটিক রোগীরা ব্যথা টের পান না। ফলে নিয়মিত চাপের ফলে সে স্থানে ঘা হয়, গ্যাংগ্রিন সংক্রমণ হয় এবং কখনো পা কেটে ফেলতে হয়। পেডোগ্রাফের সাহায্যে আগে থেকেই উচ্চচাপবিশিষ্ট অঞ্চলগুলো খুঁজে বের করে রোগীর সে অবস্থায় পৌঁছার অনেক আগেই ব্যবস্থা নেয়া যায়। আবার হাঁটার সময় সমস্যাটা আরো বেশি হয়। তাই স্থিরচিত্রের চেয়ে হাঁটার সময় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিমাপ করার জন্য ডায়নামিক পেডোগ্রাফের প্রয়োজন। বাইরে থেকে আসা এ ধরনের যন্ত্রের দাম প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এর দশ ভাগের এক ভাগ দামে দেয়া যাবে আমাদের উদ্ভাবিত ডায়নামিক পেডোগ্রাফ যন্ত্র। করাচি শহরের একটি হাসপাতালের চিকিত্সকের অনুরোধে আমাদের বিভাগ যন্ত্রটি তৈরি করে ২০১০ সালে। তখন থেকে তা করাচির এ হাসপাতালে চলছে। পরে আরো দুটি যন্ত্র নিয়েছে তারা। ইদানীং আকিজের ফার্ম ফ্রেশের অনুদানে ঢাকার ওয়ারীর ইব্রাহিম হাসপাতালের ফুটকেয়ার ইউনিটে এর একটি যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।
৬. অতিরিক্ত হাত-পা ঘামের বৈদ্যুতিক চিকিত্সাযন্ত্র। প্রসিদ্ধ চর্ম চিকিত্সক ড. রেজা বিন যায়েদের অনুরোধে নব্বইয়ের দশকে লেখক যন্ত্রটি নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি করেন। আয়োন্টোফোরেসিস নামে এ যন্ত্র এক-দেড় মাস পর পর কয়েক দিন ব্যবহার করে রোগী স্বাভাবিক থাকতে পারে। লেখক নিজের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমত এটি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেন। বর্তমানে সহযোগী অংশীদারবিহীন কোম্পানি বাইবিট লি. এটি বাজারজাত করছে।
৭. ফিজিওথেরাপির জন্য মাসল ও নার্ভ স্টিমুলেটর। ফিজিওথেরাপিতে মাংসপেশিকে সতেজ রাখতে এ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশেও এ যন্ত্র লেখক ডিজাইন করেন নব্বইয়ের দশকে। দেশের অনেক ফিজিওথেরাপিস্ট ক্লিনিক এ যন্ত্র ব্যবহার করছে।
৮. আশির দশকে বাঁশের ডালা, খড়, স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগ ও শিট ব্যবহার করে লেখক একটি উদ্ভাবন করেন, যা দিয়ে সূর্যের কিরণে প্রায় ৫ লিটার পানির তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে ওঠানো যায় দেড়-দুই ঘণ্টায়। এ তাপমাত্রায় ডায়রিয়াজনিত রোগের সব জীবাণু ধ্বংস হয়, যে পদ্ধতির বিখ্যাত নাম হচ্ছে পাস্তুরিতকরণ। ফলে নদী, খাল-বিলের পানি পানের জন্য নিরাপদ করা যায়। তবে তখন বিকল্প টিউবওয়েলকে নিরাপদ ভাবায় লেখক এ পদ্ধতি তেমন প্রচার করেননি। কিন্তু ইদানীং টিউবওয়েলে আর্সেনিক চলে আসার খবরে এখন যন্ত্রটির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে দেখা দিচ্ছে। একটি পণ্য হিসেবে বিক্রির জন্য বিভাগে আরো কয়েকটি ডিজাইন উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাঁশের ডালা ও খড়ের পরিবর্তে ফোম-প্লাস্টিক (বাজারে কর্ক শিট নামে পরিচিত) ব্যবহার করে একটি উন্নত যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে, যা পানিকে পাস্তুরিত করতে পারবে, আবার বৃষ্টির সময় পরিষ্কার বৃষ্টির পানি সংগ্রাহক হিসেবেও কাজ করবে। কড়া রোদে দেড়-দুই ঘণ্টায় প্রায় ১০ লিটার পানি পাস্তুরিত করবে এ যন্ত্র। একজনের দৈনিক ২ লিটার পানের পানির চাহিদা ধরলে একটি পরিবারের প্রয়োজন এটি মেটাবে সহজে। গ্রীষ্মকালে দিনে দুবার বা তিনবার ব্যবহার করে দু-তিনটি পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারবে যন্ত্রটি।
৯. কৃত্রিম হাত। একটি গরিব মেয়ে ফুটপাতে ফেলে রাখা একটি বোমা নিয়ে খেলছিল। মুহূর্তেই সেটি বিস্ফোরিত হয়ে কব্জি থেকে তার হাতটি উড়ে যায়। চিকিত্সার পর লেখক চিন্তা করছিলেন, কীভাবে তাকে  কিছুটা হলেও কার্যক্ষম কৃত্রিম হাত বানিয়ে দেয়া যায়। মাংসপেশি থেকে সংকেত নিয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় হাত বানানোর কাজে এগোনো হলো অনেকটা। কিন্তু এর ওজন ও ব্যাটারি পরিবর্তনের খরচের কথা ভেবে লেখক অন্যভাবে করার চিন্তা করেন। আবার হাতটি দেখতে যেন দৃষ্টিনন্দন হয়, সেদিকেও তার খেয়াল। হঠাত্ করেই মাথায় আসে পোশাকের দোকানে সাজানো পুতুলের কথা। এগুলোর একটি হাত ব্যবহার করে তার বুড়ো আঙুলটি কেটে আবার স্প্রিংয়ের সাহায্যে লাগিয়ে দিলেন। একটি অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম ও ভেলক্রো ফিতার সাহায্যে মেয়েটি নিজেই পরতে পারল হাতটি। এখন সে এটি ব্যবহার করে কলম ধরে লিখতে পারে, কলমটি উল্টিয়ে ধরে কম্পিউটারে টাইপ করতে পারে, সোলডারিং আয়রন ধরে ইলেকট্রনিক সার্কিট ঝালাই করতে পারে। বিভিন্ন নিত্যকার কাজেও সে হাতটি ব্যবহার করতে পারছে। ৫-১০ হাজার টাকায় হাতটি লাগিয়ে দেয়া যাবে। এ কাজেও অর্থসহায়তা দিয়েছে আকিজ গ্রুপের ফার্ম ফ্রেশ। উদ্ভাবনটির সুফল সুলভে আরো অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য ইদানীং বেক্সিমকো অর্থসহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশী প্রবাসীদের কেউ কেউ সহায়তা করতে চাইছেন। হাতটিকে স্বয়ংক্রিয় করার কাজটি আবার শুরু করা হয়েছে। যাদের হাত কনুইয়ের ওপরে কেটে গেছে, তাদের জন্যও কৃত্রিম হাত তৈরি করার কাজে হাত দেয়া হবে শিগগিরই। বিদেশ থেকেও এ হাতের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন কয়েকজন।
এ বিভাগের আরো গবেষণা ও উদ্ভাবনের কাজ চলছে, যার কিছু ফল হয়তো শিগগিরই আসবে, আবার কোনোটির ফল পেতে হয়তো বেশ কিছু বছর লেগে যাবে। মূলত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে ও সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে এ বিভাগ আদর্শ স্থাপন করেছে তরুণ বিজ্ঞানীদের সামনে; কয়েক বছরেই যার সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ। বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণরা এসে এ বিভাগের গবেষণা দেখছেন ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। যদিও স্থানাভাবে তাদের সবাইকে সুযোগ দেয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময় দেশের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে অনুদান পেয়েছে লেখকের নেতৃত্বে এ গবেষক দলটি। ইউনেস্কো ও অনেক আগে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন থেকেও অনুদান পাওয়া গেছে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার জন্য অনুদান দিয়েছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ ওডিএ। ইদানীং সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আন্তর্জাতিক সায়েন্স প্রোগ্রাম ২০১০ সাল থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ অনুদান দিয়ে যাচ্ছে, যা আরো অনেক বছর চলবে বলে আশা করা যায়।
এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য দর্শন হচ্ছে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পৃথিবীর সবার কাছে পৌঁছে দেয়া। বর্তমান পৃথিবীর চল অনুযায়ী নিজেই উদ্ভাবনের সব আর্থিক সুফল ভোগ না করা। এজন্য বিভাগটি তার কোনো উদ্ভাবনই পেটেন্ট করছে না। বরং তা প্রবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ করে, এমনকি নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে অন্যদের শিখিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয় তারা। এরই মধ্যে ২০১৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক ট্রেনিং ওয়ার্কশপের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত কম্পিউটারাইজড ইসিজি যন্ত্রটি তৈরির যাবতীয় কৌশল শিখিয়ে দেয়া হবে তৃতীয় বিশ্ব থেকে আসা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের, যেন তারা নিজেদের দেশে গিয়ে যন্ত্রটি তৈরি করে জনসাধারণের কাছে সুলভে বিক্রি করতে পারেন। জেনেভায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সম্মেলনসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দর্শন ও এ ওয়ার্কশপের ঘোষণা প্রচার করেছেন লেখক এবং বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে উত্সাহ পেয়েছেন। লেখকের নেতৃত্বে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে শীগগিরই, যার নাম স্থির করা হয়েছে সেন্টার ফর টেকনোলজি ইকুয়ালাইজেশন (সিটিই)। সেজন্য অনুদান খোঁজা হচ্ছে, কিছু প্রাথমিক সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীতে হয়তো অচিরেই নতুন একটি আন্দোলনের সূচনা করবে বাংলাদেশের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন
বায়োমেডিকেল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়