রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে

 
দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হরতাল-অবরোধসহ নানা সহিংস ঘটনায় গত বছরজুড়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এলেও বিদেশি বিনিয়োগে এর প্রভাব পড়েনি। বরং আগের কয়েক বছরের তুলনায় গত বছরটিতে বেশি বিনিয়োগ এসেছে। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) প্রতিবেদনে এমন তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে।
আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন-২০১৪ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে ১৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে। এটা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। কেননা ২০১২ সালে দেশে এফডিআই এসেছে ১২৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে এফডিআইয়ের অন্তর্মুখী প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বহির্মুখী প্রবাহ কমেছে। গত বছর এফডিআইয়ের বহির্মুখী প্রবাহ ছিল তিন কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০১২ সালে যা ছিল পাঁচ কোটি ৩০ লাখ।
গতকাল মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক, জেনেভা, দিল্লি, টোকিওসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবেদনটি একযোগে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বোর্ড আঙ্কটাডের পক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে সংস্থাটির সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিনিয়োগ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে যেসব এফডিআই প্রক্রিয়াধীন ছিল, এর একটি বড় অংশ গত বছর এসেছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা খুব একটা বাধা হতে পারেনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর আস্থা তৈরি হওয়ায় প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও এফডিআই প্রবাহে এমন গতি এসেছে। সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের মধ্যে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেখছেন কোথায় কোন খাতে বিনিয়োগ করা যায়। কোন খাতে বেশি বিনিয়োগ আসবে, তা বলতে পারব না। তবে এটা বলতে পারব যে আগামীতে বিদেশি বিনিয়োগে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।’
বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এস এ সামাদ বলেন, ‘গত বছর যে পরিমাণ এফডিআই এসেছে, এর একটি বড় অংশই এসেছে প্রথম ছয় মাসে। ওই সময়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলার এফডিআই দেশে এসেছে। বাকি ৬০ কোটি ডলার এসেছে পরের ছয় মাসে।’
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩ সালে আসা এফডিআইর মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন বিনিয়োগ ছিল ৫৪ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে অর্জিত আয় পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। এই খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৬৯ কোটি৭০ লাখ ডলার, যা ২০১২ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। আর মূল কম্পানি থেকে বাংলাদেশে কার্যরত কম্পানিগুলো ঋণ (আন্তকম্পানি ঋণ) এনেছে ৩৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। এটা ২০১২ সালের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি।
খাতওয়ারি বিনিয়োগের তথ্যে দেখা যায়, গত বছর টেলিকমিউনিকেশন খাতে এফডিআই প্রবাহ কমেছে। ২০১৩ সালে এই খাতে বিনিয়োগ এসেছে ৩২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এর আগের বছর এটা ছিল ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তবে ব্যাংকিং খাতে এফডিআই বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১২ সালে ব্যাংকিং খাতে এফডিআই এসেছিল ১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১৩ সালে তা বেড়ে ৩২ কোটি ৭০ লাখ ডলার হয়।

 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক আজিজুর রহমান বলেন, ব্যাসেল-২ অনুসারে ২০১৩ সালের জুনের মধ্যে ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার শর্ত ছিল। বিদেশি ব্যাংকগুলো সেই শর্ত পূরণ করেছে। ব্যাংক খাতে এফডিআই বাড়ার এটাই কারণ।
২০১৩ সালে সবচেয়ে বেশি এফডিআই এসেছে বস্ত্র ও পোশাক খাতে। ওই বছর এ খাতে ৪২ কোটি ২০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ আসে। ধারণা করা হচ্ছে, চীন থেকে পোশাক খাতের যেসব বিনিয়োগ সরে গেছে, এর একটি অংশ বাংলাদেশে এসেছে।
তবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে এফডিআই কমেছে। ২০১৩ সালে এই খাতে এফডিআই এসেছে ৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের, যা আগের বছর ছিল ১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষি ও মৎস্য খাতেও বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে এস এ সামাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে ঋণের সুদ হার অনেক বেশি। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে লাভ করা অসম্ভব। এ ছাড়া ট্যাক্স রেট, আদায় পদ্ধতি- এসব বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।’
আলোচ্য বছরে সারা বিশ্বে এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে ৯ শতাংশ। ২০১৩ সালে বিশ্বের সব দেশে অন্য দেশ থেকে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী এফডিআই প্রবাহ একই হবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৮ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, চীন ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের সাত হাজার ৯০০ কোটি ডলার রয়েছে।
আঙ্কটাড ধারণা করছে, ২০১৪ সালে এফডিআই প্রবাহ কিছুটা বেড়ে এক লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার হবে। পর্যায়ক্রমে ২০১৬ সালে তা হবে এক লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/06/25/99992#sthash.3mwkeHbz.dpuf