বিশ্বে অশান্তি বাড়ছেই, বৈশ্বিক শান্তি সূচকে বাংলাদেশের সাত ধাপ উন্নতি

‘কোথায় গেলে পাব শান্তি’- ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা অশান্তির প্রেক্ষাপটে এমন স্বগতোক্তি অনেকেই করে থাকেন। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (ইইপি) এই শান্তির ঠিকানার একটি র‌্যাংকিং ঘোষণা করেছে। তাদের মতে, এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে শান্তির দেশ আইসল্যান্ড। এর পরেই আছে ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নাম। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, গড়পড়তায় বিশ্বে কোথাও আর আগের মতো শান্তি নেই এবং দিন দিন এই শান্তি কমে আসছে। ২০০৮ সাল থেকে প্রতিবছরই বিশ্ব কম শান্তিপূর্ণ হচ্ছে।
২০১৪ সালের বৈশ্বিক শান্তি সূচকে (গ্লোবাল পিস ইনডেক্স) এই চিত্র তুলে ধরেছে ইইপি। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব এই শান্তি কেড়ে নিচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে সূচকে। এর মধ্যে কিছুটা আশাবাদী হতে পারে বাংলাদেশিরা।
বৈশ্বিক শান্তি সূচক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার বড় দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে শান্তিতে এগিয়ে বাংলাদেশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়। শুধু তাই নয়, গত এক বছরে বিশ্ব শান্তি সূচকে বাংলাদেশ সাত ধাপ এগিয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ ভুটান, যা বিশ্বের শীর্ষ শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিচের দিকে।
ইইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২টি নির্দেশক (ইন্ডিকেটর) ব্যবহার করে বিশ্বের শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। গত বছর (২০১৩) এই ২২ নির্দেশকের মধ্যে চারটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শান্তি বিনষ্ট হয়েছে। এগুলো হলো সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সংঘাতের পরিমাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের শতকরা হার এবং সংঘবদ্ধ অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা। গত কয়েক বছরের শান্তির নির্দেশকগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের ৭০ শতাংশ দেশই অন্তত ১০টি নির্দেশকে পিছিয়ে পড়েছে। সিরিয়ার চলমান গৃহযুদ্ধ দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে অশান্তিপূর্ণ দেশে পরিণত করেছে। এমনকি আফগানিস্তানের চেয়েও দেশটির অবস্থা এখন খারাপ। তালিকায় ইউরোপের দেশগুলোই এগিয়ে।
সূচকে আরো বলা হয়, চলতি বছর এবং আগামী বছরগুলোতে দুটি দেশের শান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। দেশগুলো হলো ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজক দেশ কাতার এবং ইউরোপের মুসলিম দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। তবে গত এক বছরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনেক অগ্রসর হওয়া দেশগুলো হচ্ছে জর্জিয়া, জাম্বিয়া, হাইতি, আর্জেন্টিনা, শাদ, নেপাল, বুরুন্ডি ও লাইবেরিয়া।
২২ নির্দেশক : যেসব দিক বিবেচনা করে বিশ্ব শান্তি সূচক তৈরি করা হয় সেগুলো হলো সামাজিক অপরাধ, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশ, হত্যাকাণ্ড, কারাবন্দি মানুষের সংখ্যা, অস্ত্র ব্যবহারের সহজলভ্যতা, অভ্যন্তরীণ সংঘবদ্ধ সংঘাত, সহিংস বিক্ষোভ, সহিংস অপরাধ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, অস্ত্র আমদানি, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মৃত্যু, সামরিক ব্যয়, সশস্ত্র বাহিনী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা রক্ষা কার্যক্রমে তহবিল, পরমাণু ও ভারী অস্ত্র, অস্ত্র রপ্তানি, বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা। এ ছাড়া বিদ্যুতায়ন, সরকারের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বেসামরিক নাগরিকদের স্বাধীনতা, দুর্নীতি, লিঙ্গ বৈষম্য, বেকারত্ব, স্কুলে ভর্তির হারসহ আরো বিষয় ‘অন্যান্য নির্দেশক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শীর্ষ শান্তির ১০ দেশ : তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ১০টি দেশ হলো পর্যায়ক্রমে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, কানাডা, জাপান, বেলজিয়াম ও নরওয়ে। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি দেশ গত বছরও একই অবস্থানে ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভুটানের অবস্থান ১৬তম।
শীর্ষ অশান্তির ১০ দেশ : বিশ্বের সবচেয়ে অশান্তিপূর্ণ ১০টি দেশ হলো পর্যায়ক্রমে সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ইরাক, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য আফ্রিকা, কঙ্গো, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া। তবে অর্থনীতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে থাকলেও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ১০১।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া : সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেক এগিয়ে ভুটান। দেশটি বিশ্বের ১৬তম শান্তির দেশ। এই অঞ্চলের দ্বিতীয় শান্তিপূর্ণ দেশ হলো নেপাল। দেশটির অবস্থান ৭৬তম। দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় শান্তির্পূণ দেশ হলো বাংলাদেশ। গত বছর বাংলাদেশের র‌্যাংকিং ছিল ১০৫। এবার সাত ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। এর পরেই রয়েছে শ্রীলঙ্কা, র‌্যাংক ১০৫। ভারতের অবস্থান ১৪৫। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ হলেও ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও স্যানিটেশনের দিক দিয়ে দেশটির অর্ধেক মানুষ এখনো মধ্যযুগীয় জীবন যাপন করে। পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৪তম এবং আফগানিস্তানের অবস্থান ১৬১তম।
শান্তির নির্দেশকগুলোতে বাংলাদেশ : সূচক নির্ধারণে শান্তির প্রতিটি নির্দেশকের পাঁচটি পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়। এই পাঁচ পয়েন্টের মধ্যে যাদের অবস্থা পাঁচে পাঁচ, সে দেশটি ওই নির্দেশকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানের কথা নির্দেশ করে। আর পয়েন্ট যত কম, তত ভালো বা শান্তির বার্তা দেয় সূচকে।
এবারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পয়েন্ট ৩। নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশ পয়েন্ট ১, হত্যাকাণ্ডে ২, কারাবন্দি মানুষের সংখ্যার ক্ষেত্রে ১, অস্ত্র ব্যবহারের সহজলভ্যতায় ৩, অভ্যন্তরীণ সংঘবদ্ধ সংঘাতে ৩, সহিংস বিক্ষোভের ক্ষেত্রে ৫, সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে ৩, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৫, রাজনৈতিক সন্ত্রাসী নির্দেশকের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ৫, অস্ত্র আমদানিতে ১, সন্ত্রাসী তৎপরতায় ২ দশমিক ৫, অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মৃত্যুর সংখ্যায় ১, সামরিক ব্যয়ে ১ দশমিক ৫, সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী সদস্যদের ক্ষেত্রে ১, জাতিসংঘ নিরাপত্তা রক্ষা কার্যক্রমে তহবিলের ক্ষেত্রে ৫, পরমাণু ও ভারী অস্ত্রের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৫, অস্ত্র রপ্তানিতে ১, বাস্তুচ্যুত মানুষের শতকরা হারে ১, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ১, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ১ এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে মৃতের সংখ্যার নির্দেশকের ক্ষেত্রে ১ পয়েন্ট। এ ছাড়া জেন্ডার ইস্যু ও গড় আয়, স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন আগের চেয়ে ভালো। সূত্র : দি গার্ডিয়ান ও ইইপি ওয়েবসাইট।