বাংলাদেশ এখন আর দুর্যোগপূর্ণ বা গরিব দেশ নয় – এডিবি প্রেসিডেন্ট

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট তাকিহিকো নাকাও বলেছেন, আগামী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার হবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে বাংলাদেশ সরকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীল এ হার এবং দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের অর্জন ব্যাপক প্রশংসার। রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এডিবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এডিবি প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৩১ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টি বিশাল অর্জন। তবে আরও উন্নতি করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ বিনিয়োগ আছে অবকাঠামো খাতে। যা খুবই কম। এর পরিমাণ বাড়াতে পারবে সেই সম্ভাবনা বাংলাদেশের আছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো খাত যেমন- বিদ্যুত, গ্যাস, রাস্তাঘাট, রেলওয়ে, নাগরিক সেবা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা বিশেষ করে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ক্ষেত্রে এডিবি সহায়তা করছে। আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং এনার্জি ট্রেডের ক্ষেত্রেও এডিবি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে নাকাও বলেন, পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বিবেচনা করে আমরা অর্থায়নে এগিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটির কাজ আর এগোনো যায়নি।
এডিবি প্রেসিডেন্ট জানান, সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কিভাবে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ সহজ করা যায়, প্রকল্প প্রয়োগ প্রক্রিয়া, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রভৃতি বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্বে বাংলাদেশ এখন আর দুর্যোগপূর্ণ বা গরিব দেশ হিসেবে পরিচিত নয় বলে মনে করেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সফররত প্রেসিডেন্ট তাকাহিকো নাকাও। তাকাহিকো সাংবাদিকদের বলেন, এখানে ছোটখাটো যেসব রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিবিদরাই মিটিয়ে ফেলতে পারেন। এদেশের গণতন্ত্র এখন এমন পর্যায়েই পৌঁছেছে।
শনিবার রাতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ম্যানিলা থেকে ঢাকায় আসার পর ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন তাকাহিকো নাকাও। গত বছরের প্রথমদিকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাকাহিকো নাকাওর এটাই বাংলাদেশে প্রথম সফর। সফরকালে সংস্থাটির অর্থায়নে বাস্তবায়িত পাঁচটি প্রকল্প পরিদর্শন করবেন। ১৭ জুন তাকাহিকো নাকাও শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন।
সূত্র জানায়, এডিবি প্রতিবছর গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা দিয়েছে এ সংস্থা। এর মধ্যে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাত করেন সফররত এডিবি প্রেসিডেন্ট তাকাহিকো নাকাও। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, সাক্ষাতকালে তাকাহিকো নাকাও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, তাকাহিকো নাকাও বিশেষ করে প্রবৃদ্ধি ৬-এর ওপরও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং এর ধারাবাহিতার প্রশংসা করেছেন। শিক্ষাকে দারিদ্র্য নিরসনের মূল হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার কথা বলেছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। মৌলবাদ বন্ধে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সহায়তা করবে বলেও প্রধানমন্ত্রীকে জানান তাকাহিকো নাকাও।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী এডিবি প্রধানকে জানান, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভরতা অনেক কমেছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সরকারী কর্মকর্তারা করের আওতায় এসেছে বলে অবহিত করেন তিনি। বৈঠকে তাকাহিকো নাকাও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থারও প্রশংসা করেন।
এডিবি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দেবে বলেও জানান এডিবি প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এডিবি যে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে- তা অব্যাহত রাখারও আশ্বাস দিয়েছেন তাকাহিকো নাকাও। শামীম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা এডিবি থেকে আরও সহায়তা পেলে আরও উন্নয়ন করব। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ছাড়াও এ্যাম্বাসেডর এ্যাটলার্জ এম জিয়াউদ্দিন, মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মোঃ মেজবাহ উদ্দিন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
জাইকার সঙ্গে ৫ প্রকল্পের ঋণচুক্তি আজ :
অবকাঠামো খাতের ৫ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করবে জাপান। রবিবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ের তথ্য অধিদফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পগুলো হচ্ছেÑ মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার পাওয়ার প্রজেক্ট, ন্যাচারাল গ্যাস ইএসিয়েন্সি প্রজেক্ট, ইনক্লুসিভ সিটি গবর্নেন্স প্রজেক্ট, হাওড়ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড লাভলিহুড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট এবং স্মল এ্যান্ড মার্জিনাল সাইজড ফার্মার্স এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট এ্যান্ড ডাইভারসিফিকেশন ফিন্যান্সিং প্রজেক্ট।
এ উপলক্ষে সোমবার বিকেলে হোটেল সোনারগাঁওয়ে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হবে। সফররত জাইকার প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকার উপস্থিতিতে এতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মেজবাহ উদ্দিন ও জাপান ইন্টারনেশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) পক্ষে ঢাকার প্রধান প্রতিনিধি মিকিও হাতাদা ঋণচুক্তি সই করবেন। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বিশেষ অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান ও বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।