সমুদ্র জয় : ইতিহাসের অন্যতম সফলতা

কূটনৈতিক নানা সাফল্যের কথা এলেই প্রথমে যে সমুদ্র জয় সামনে চলে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ জয় ছিল বাংলাদেশের জন্য অন্যতম একটি অর্জন। কেননা সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের ভৌগোলিক সীমা নির্দিষ্ট হলেও সমুদ্রসীমা নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে মতানৈক্য চলে আসছিল স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার আগে অনেক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু তা বারবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর পরই বাংলাদেশ আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। আর প্রতিবারের ব্যর্থতাই এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ফলে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর দুই দেশকে আন্তর্জাতিক সালিশের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য নোটিশ পাঠায় বাংলাদেশ। আর ইটলসের বিধান মোতাবেক সালিশ নোটিশ জারি করায় উভয় পক্ষ তা মেনেও নেয়।

বঙ্গোপসাগরের জলসীমা নির্ধারণ ও সমুদ্রসম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ১৪ ডিসেম্বর, ২০০৯ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এবং ভারতের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত সালিশ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করে। ট্রাইব্যুনালের ২১ জন এবং বাংলাদেশের নিযুক্ত টমাস মেনেশ ও মিয়ানমারের নিযুক্ত বার্নাড অক্সম্যানের সমন্বয়ে সর্বমোট ২৩ জন বিচারক এ মামলার রায় প্রদান করেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, তার পরও চলে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ২০১০ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ দাবি পেশ করে। একই বছরের ১ ডিসেম্বর পাল্টা দাবি পেশ করে মিয়ানমার। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ জবাব দেয় এবং ওই বছরের ১ জুলাই তার প্রতিবাদ করে মিয়ানমার।
পরবর্তীতে দাবি-পাল্টা দাবির পর ২০১১ সালের ৮ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের আদালত কক্ষে মৌখিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। যে শুনানিতে বাংলাদেশের সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বাংলাদেশের এজেন্ট হিসেবে যুক্তি উপস্থাপন করেন। আর মিয়ানমারের এজেন্ট ছিলেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ড. তুন শিন। বাংলাদেশের ডেপুটি এজেন্ট ছিলেন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম।
যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৪ মার্চ, ২০১২ বাংলাদেশ-মিয়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত বাংলাদেশের যৌক্তিক ন্যায্যতাভিত্তিক দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেয়। এর ফলে আমরা যেমন পেয়েছি জলসীমা, তেমনি এ রায়ের সঙ্গে সঙ্গে মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়। যে রায় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক রায়। আর ট্রাইব্যুনালের এ চূড়ান্ত রায় এমন যে তা আর কোনো আদালতে আপিলও করা যাবে না।
এ রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ পায় ১ লাখ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি জলসীমা। বাংলাদেশ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ২১৫ ডিগ্রি দিগংশ বরাবর বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল সীমানা এবং মহীসোপানে অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মিয়ানমারের দাবি ছিল ইকুডিসটেন্স ফর্মুলা প্রয়োগ করা। আর এ ফর্মুলা প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশের জন্য সুষম সমুদ্রসীমা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাতে বাংলাদেশ বড়জোর ১৩০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত জলসীমা পেতে পারত, যা বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমারের জলবেষ্টিত একটি অঞ্চলে আটকে থাকত। আর তখন মহীসোপানের ওপর বাংলাদেশ কোনো দাবিও করতে পারত না। এখন মহীসোপান থেকেও বাংলাদেশ সমুদ্র ভাগ দাবি করছে। এর সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল সুষ্ঠু ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে মহীসোপানেও বাংলাদেশের দাবি করার যৌক্তিক ভিত্তি দেয়ায় ভারতের সঙ্গে সমদ্রসীমা নির্ধারণেও একই নীতি অনুসরণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। যদিও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটেছে, তবু ভারতের বিপক্ষে করা সালিশ এখনো শেষ হয়নি। আর এ রায় ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসংক্রান্ত বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ফলে প্রাণিজ ও খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিজ এলাকায় নির্বিঘ্নে এসব সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে। কেননা বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমার মাছ, তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ এখন বাংলাদেশের। দেশের স্থলভাগে ২৫০ প্রজাতির মাছ পেলেও সমুদ্রে আছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। ফলে এগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে তা অর্থনৈতিকভাবেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া সমুদ্রের প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, শ্যাওলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। আছে ম্যাগনেসিয়াম, নিকেল, কপার ও কোবাল্টের মতো দুষ্প্রাপ্য এবং একই সঙ্গে মূল্যবান খনিজপ্রাপ্তির সম্ভাবনা। এ রায়ের ফলে বাংলাদেশের অগ্রতির ক্ষেত্রে সার্বিকভাবেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর তার জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা। যদিও এ ক্ষেত্রে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নানারকম সীমাবদ্ধতা আসতে পারে, যা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয় খোলার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাও প্রশংসার যোগ্য। কেননা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগাতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষিত জনসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর তা নিশ্চিত হলে সম্পদ বণ্টন, ব্যবহার, উত্তোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রেই পরনির্ভরশীলতা কমে আসবে।
প্রসঙ্গত, আদালতের রায় বাংলাদেশের পক্ষে এসেছে এটা ঠিক কিন্তু তার পরও এর ব্যবহার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা এখনো সম্ভব হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে। সম্ভব হয়নি রায়ের ফলে পাওয়া জলসীমায় বাংলাাদেশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। উপরন্তু এ এলাকাগুলোয় মিয়ানমারের অধিবাসী, মৎস্যজীবীসহ নানা পেশার মানুষ মাছসহ মূল্যবান সম্পদ আহরণ করছেন বলে অভিযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে রায় পেয়ে শুধু বসে থাকলে হবে না, সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিজ অঞ্চলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে। তবেই এ জয়ের যথার্থতা অর্জিত হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে জ্বালানিসহ সমুদ্রসম্পদ আহরণের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার ব্যবহার নিশ্চিত করে সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা গভীর সমুদ্র পর্যন্ত মৎস্যসম্পদ আহরণ করতে পারার যে অধিকার পেয়েছেন, তা যেন প্রতিষ্ঠিত হতে বিলম্ব না হয় সেদিকে সরকারকেই দৃষ্টি দিতে হবে।
এ রায় আমাদের পক্ষে এসেছে তা যেমন ইতিবাচক দিক, তেমনিভাবে এও জরুরি যখন ধারণা করা হচ্ছে গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের এলাকায় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও ২০০ ট্রিলিয়ন কিউসিক ফিট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ রয়েছে, তখন তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। স্বাভাািবকভাবেই এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশ বড় ধরনের জ্বালানি সঙ্কটের মুখোমুখি পড়তে যাচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এ মজুদ সম্পদকে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া এ রায়ের ফলে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাবে এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের সীমানায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি ২০০৮-এর অধীনে চুক্তি করলেও যে কোনো মূল্যে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়, সে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ ঐতিহাসিক রায়ের ফলে যে সমুদ্রসীমা আমরা পেয়েছি তা দেশ ও জাতির স্বার্থে সমৃদ্ধি বয়ে আনবে_ এরকম সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক পদক্ষেপ নেয়া।