বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রশংসা ইউকে ইনভেস্টমেন্ট মিনিস্ট্রির

লন্ডন: ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যআয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির দারিদ্র্যসীমা গত এক দশকে আগের তুলনায় নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।
ট্রেড ও ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের ‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গাইডেন্স রিপোর্টে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে এমনই মন্তব্য করেছে ব্রিটেন।
শুক্রবার ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট মিনিস্ট্রি প্রচারিত এই রিপোর্টের একটি কপি বাংলানিউজেও পাঠানো হয়েছে।
রিপোর্টে বাংলাদেশে ব্রিটিশ বিনিয়োগ ও রফতানির উপকারিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলা হয়, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বনিম্ন ৫.৩ ভাগ, যা ২০১৩ অর্থবছরে উন্নীত হয় ৬ ভাগে। এ প্রসঙ্গে আগামী অর্থবছরে এই হার ৭ ভাগে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়।
বাংলাদেশের বিজনেস কমিউনিটিতে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার, বাংলাদেশিদের কাছে ব্রিটিশ তৈরি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও চাহিদা এবং দেশটিতে স্বল্প ট্যাক্সে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির সুযোগের কথাও ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের জানানো হয় গাইডেন্স রিপোর্ট ‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’-এ।
বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি বিদেশি ব্যবসায়ীদের অন্যতম আকর্ষণ মন্তব্য করে গাইডেন্স রিপোর্টে বলা হয়, গত ৫ বছরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রফতানি বেড়েছে আগের তুলনায় চারগুণ।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের ধারণা দিতে গিয়ে ‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক গাইডেন্স রিপোর্টে বলা হয়, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি হার ছিল ৬ ভাগ।
নির্মাণশিল্প এবং ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের প্রসারের তথ্য প্রকাশ করে ২০১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধির হার ৯ ভাগ ছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। দেশটির মুদ্রাস্ফীতির হারও কমেছে জানিয়ে বলা হয়, ২০১২ সালে মুদ্রাস্ফীতির হার যেখানে ছিল ১০.৬ ভাগ, সেখানে  ২০১৩ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৭.৭ ভাগে।
রিপোর্টে বলা হয়, রফতানিতে ১০.৭ ভাগ ও আমদানিতে মাত্র ০.৮ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর ২০১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ৫.১ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত রাখতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের আয়তন এখন ২৫ বিলিয়ন ডলার, এমন মন্তব্য করে ব্রিটিশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের গাইডেন্স রিপোর্টে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৃতীয় এবং আমেরিকায় বাংলাদেশ এখন চতুর্থ বৃহত্তম বস্ত্র রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ।
১৪৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশকে ‘পৃথিবীর সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করে রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ৮৪৫ মার্কিন ডলার এবং বর্তমানে দেশটির ৩৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্যের পরিধি সম্পর্কে তথ্য জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, ২০১২ সালে ব্রিটেন বাংলাদেশে ৪২৪ মিলিয়ন পাউন্ডের পণ্য ও সেবা রফতানি করেছে। এর মধ্যে সেবার পরিমাণ ছিল ৭০ ভাগ এবং পণ্যের পরিমাণ ছিল ১৪১ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের।
২০১২ সালে বাংলাদেশে ব্রিটেনের প্রধান প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে ছিল, পাওয়ার জেনারেটিং মেশিনারিজ ও ইক্যুইপমেন্ট, ইস্পাত, পশুখাদ্য, জেনারেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি ও ইকুইপমেন্ট এবং বিশেষ ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে ‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের চেয়েও বেশি নির্ভরশীল দেশটির মানবসম্পদের ওপর।
মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগই শিক্ষার্থী, যা প্রায় ২৯ মিলিয়ন।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে ব্যাপক সহযোগিতা দিচ্ছে মন্তব্য করে রিপোর্টে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই খাতে তহবিল দিয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটসহ উচ্চ শিক্ষা ও বিভিন্ন কোর্সভিত্তিক শিক্ষায় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতা করতে পারে। এই সেক্টরের যেসব ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে, তার মধ্যে ট্রিচার্স ট্রেনিং, জয়েন্ট ডিগ্রি অ্যান্ড রিসার্চ প্রোগ্রাম, রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ, কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স প্রোগ্রাম, স্টুডেন্ট একচেঞ্জ অ্যান্ড স্কিল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের কথা উল্লেখ করা হয় রিপোর্টে।
বাংলাদেশের বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস সেক্টরের সঙ্গে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট মিনিস্ট্রির রিপোর্টে বলা হয়, লাইফ সায়েন্স এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি উদীয়মান ব্যবসা ক্ষেত্র।
২০১৩ অর্থবছরে এই সেক্টরের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪.৩ ভাগ, যা ১.১৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মূল্যমান। এই সেক্টরে ব্যবসারত বাংলাদেশের বেশিরভাগ কোম্পানি এখন নিজেদের কোম্পানির জন্য বিদেশি পার্টনার খুঁজছে।
বাংলাদেশের নিবন্ধনকৃত মোট ২৬০টি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির ১৯১টিই বর্তমানে ব্যবসা করছে, জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদার মোট ৯৭ ভাগই এই সব কোম্পানি পূরণ করছে।
এই সেক্টরের যে সব প্রোডাক্ট এখনও বাংলাদেশ আমদানি করছে, তার মধ্যে ভ্যাকসিন, অ্যান্টি-ক্যান্সার প্রোডাক্ট হ্যামাটোরজিক্যাল প্রোডাক্ট ও বায়োটেক প্রোডাক্ট রয়েছে বলে তথ্য দেওয়া হয় রিপোর্টে।
‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক গাইডেন্স রিপোর্টে উপরোক্ত সেক্টরগুলো ছাড়াও এনার্জি, পরিবেশ ও পানি এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি সেক্টরের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে এসব সেক্টরেও ব্রিটিশ কোম্পানিগুলির বর্তমানে ব্যবসা করার সুযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়।
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট গাইডেন্স রিপোর্টে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটিশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্ভাবনার ইতিবাচক বিভিন্ন দিক তুলে ধরলেও এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের।
ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়নে ‘দুর্নীতি’-কে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ‘এক্সপোর্টিং টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক রিপোর্টে।
রিপোর্টে বলা হয়, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- দ্রুত কাজ উদ্ধারের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি মোকাবেলা করা।
রাজনীতিক, আমলা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সব জটিলতা সৃষ্টি করে থাকেন।
এ ক্ষেত্রে ব্যবসা শুরুর আগে এ বিষয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলা হয় রিপোর্টে। স্বচ্ছতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক বোঝার বিষয়েও সতর্ক করা হয় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের।
স্বল্পমূল্যের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আকর্ষণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের বাজারে স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভারত ও চীনের বিশেষ আধিপত্য রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় পণ্যের মান, লাইফ-সাইকেল কস্ট, ট্রেনিং ও বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়।