‘বাংলার আইনস্টাইন কৃষক কেনু মিয়া’

‘লোকটা দেখতে পুরোপুরি আইনস্টাইনের মতো। আইনস্টাইনের মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল ছিল, তবে উনার মাথায় সবুজ পাগড়ি। আইনস্টাইনের মুখে দাঁড়ি ছিল না, কিন্তু উনার আছে।’ সকৌতুকে কথাগুলো বলছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বাংলার এই আইনস্টাইন ৮২ বছর বয়সী কেনু মিয়া। তিনি পেশায় একজন কৃষক। যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার কারণে কেনু মিস্ত্রি নামে সমধিক পরিচিত।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) মিলনায়তনে উদ্ভাবন মেলার আয়োজন করা হয়। দুই দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। ডিআইইউ ও জনবিজ্ঞান ফাউন্ডেশন যৌথভাবে মেলাটির আয়োজন করেছে। এই মেলায় ২৯ জন লোকজ বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনসামগ্রী স্থান পেয়েছে। কৃষক কেনু মিয়া তাঁদেরই একজন।

মেলা প্রাঙ্গণে কথা হয় কেনু মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, কৃষি জমিতে অল্প সময়ে অধিক কাজ করার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত ভাবতেন। ভাবনা থেকেই ১৯৭২ সালে প্রথম উদ্ভাবন করেন লোহার পাতে নিড়ানি যন্ত্র ‘সেনি উইডার’। এরপর একে একে উদ্ভাবন করেন ৪০টির বেশি কৃষিযন্ত্র। ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের রুকনকান্দা গ্রামের কেনু মিয়ার স্কুল-কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তবুও তিনি হয়ে উঠেছেন কৃষকবান্ধব যন্ত্রপাতির কারিগর। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি জাদুঘরে তাঁর উদ্ভাবন করা সব যন্ত্র স্থান পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ধান মাড়াইয়ের আধুনিক যন্ত্র, সহজে মাটি খননের আগর যন্ত্র, গোল আলুর বীজ বপন যন্ত্র, নির্দিষ্ট দূরত্বে শস্যবীজ বপন যন্ত্র, সবজিবীজ বপন যন্ত্র, গুটিসার প্রয়োগ যন্ত্র, আঁচড় যন্ত্র, পানি সেচের হাতাকুন্দা অন্যতম।

কেনু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। এখন আর আগের মতো খাটতে পারি না। তবুও আরো নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবনের কথা সারা দিন ভাবতে থাকি। এভাবে দিন কেটে যাচ্ছে। আমার শুধু একটাই চাওয়া- আমার উদ্ভাবন করা যন্ত্র যেন দেশের কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’

কৃষিযন্ত্রের আরেক উদ্ভাবক হলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বানেশ্বর গ্রামের মো. ইয়াহিয়া মোল্লা লিপটন। তাঁর আবিষ্কার যন্ত্র তিনটি। সেগুলো হলো- সুলভ বায়োগ্যাস প্রযুক্তি, বহুমুখী সার প্রয়োগ যন্ত্র ও ভুট্টাবীজ রোপণ যন্ত্র। লিপটন জানান, তাঁর বহুমুখী সার প্রয়োগ যন্ত্র দিয়ে জমিতে সার দিলে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক সার কম লাগে। আর ভুট্টাবীজ রোপণ যন্ত্র ব্যবহার করে একজন শ্রমিক ছয়জন শ্রমিকের সমান কাজ করতে পারে। তিনি সার প্রয়োগ যন্ত্রটিকে সারা দেশে কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। এতে দেশের অর্ধেক সার নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আলু চাষিদের জন্য সুখবর নিয়ে এসেছেন ঢাকার মিরপুরের জসিম উদ্দিন খান। তিনি আলু থেকে আটা তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। একই সঙ্গে উদ্ভাবন করেছেন গাছের অকেজো পাতা থেকে কাঠ তৈরির পদ্ধতি। জসিম বলেন, প্রতিবছর সারা দেশে ৮৬ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৬৬ লাখ টন আলু কোল্ড স্টোরগুলোয় সংরক্ষণ করা হয়। বাকি ২০ লাখ টন আলু সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। কিন্তু আলু আটায় পরিণত করতে পারলে এটি এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। আলুর আটা থেকে রুটি, বিস্কুট, কেক ও আলুর ডাল তৈরি করা যাবে বলে জানান তিনি। আর অল্প টাকায় কমিউনিটি রেডিও সেবা পৌঁছে দিতে চান টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের দেওজার গ্রামের রামপ্রসাদ। তিনি কমিউনিটি রেডিও যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। এই যন্ত্র দিয়ে আট মাইল এলাকার মধ্যে সম্প্রচার করা যাবে। আরেকজন হলেন ঝিনাইদহের শৈলকুপার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আবদুস সোবহান। তিনি জ্বালানি সাশ্রয়ী পাম্প উদ্ভাবন করলেন।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দেশের লোকজ বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন উদ্ভাবন মেলার স্টল ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটা চমৎকার উদ্যোগ। গ্রামগঞ্জের লোকজ বিজ্ঞানীরা তাঁদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য অনেক নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, যা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এগুলোর বেশির ভাগই আলোর মুখ দেখে না।  তিনি দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান জানান।’

জানা যায়, দেশের তৃণমূল পর্যায়ে অনেক স্বশিক্ষিত উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাঁরা সমাজ ও দেশের মঙ্গলে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অসচ্ছলতার মধ্যেও অপরিসীম মনোবল নিয়ে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে অবদান রাখছেন। তাঁদের কেউই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে চান না। নিজেদের উদ্ভাবনকে দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য ছড়িয়ে দিতে চান টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। কিন্তু আর্থিকভাবে দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা মনোবল হারাচ্ছেন। এসব বিজ্ঞানীর উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে ২০০৯ সালের ১১ ডিসেম্বর বিসিএসআইআর মিলনায়তনে প্রথমবারের মতো মেলার আয়োজন করা হয়।