সোনালী আঁশের সুখদুঃখ ১ ॥ সুদিন আসছে

০ আশা জাগাচ্ছে বহুমুখী পাটপণ্য
০ উন্নত বিশ্বে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে
০ প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধ হওয়ায় ইইউতে প্রাকৃতিক ব্যাগের চাহিদা তৈরি হচ্ছে

কাওসার রহমান ॥ বিশ্ববাজারে বাড়ছে পাটপণ্যের চাহিদা। সে সঙ্গে আশা জাগাচ্ছে বহুমুখী পাটপণ্য। তবে পুরনো প্রযুক্তি, ডায়িং-প্যাকেজিংয়ের সুবিধা না থাকা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং ব্যাংক ঋণের সুবিধা না থাকায় বহুমুখী পাটপণ্যের বাজার ধরতে পারছে না উদ্যোক্তারা। বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে বাস্তবমুখী এ্যাকশন প্ল্যান নিয়ে এগোতে পারলে পাট আবার ‘সোনালী আঁশ’ হয়ে ফিরে আসবে।
পাট খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লবের সময় ফ্লাক্স এবং হেম্প এর স্থান দখল করে পাটের যাত্রা শুরু। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিশ্বের ৮০ শতাংশ পাট বাংলাদেশে উৎপাদিত হতো। আর আশির দশকের শুরুতেও বাংলাদেশের শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য ছিল পাট। এর পর থেকে সিনথেটিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর পেরে ওঠে না পাট। ফলে দ্রুত বাজার হারাতে থাকে। অথচ ১৯৮০-৮১ অর্থবছরেও রফতানি আয়ে পাট ও পাটপণ্যের অবদান ছিল ৬৮ শতাংশ। ১৯৯০-৯১ সালে যা ছয় শতাংশে নেমে আসে।
তবে আশার কথা হলো- উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাট আবার ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বে আবার বাড়ছে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা। বিশেষ করে জাতিসংঘ ২০০৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক তন্তু বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করার পর পাট আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ফলে কাঁচাপাট ও প্রচলিত পাটপণ্য ছাড়াই মোট রফতানিতে বহুমুখী পাটপণ্যের রফতানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় শতাংশে।
পাট খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০১৬ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে আর ২০-২১ মাসের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক সঙ্গে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক ব্যাগের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এ চাহিদার একটি অংশ ধরতে পারলেও বাংলাদেশের পাট পণ্যের রফতানি পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি ডলারের পাট ও পাটপণ্য রফতানি করে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ আসে কাঁচাপাট রফতানি থেকে। অবশিষ্ট অংশ আসে পাট সুতা, পাটের বস্তা ও অন্য পাটপণ্য রফতানি করে। অথচ সরাসরি কাঁচাপাট না করে ওই পাট দিয়ে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন করে রফতানি করতে পারলে পাট খাতের রফতানি আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিটি ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এবং দেশের অন্যতম জুট এসএমই উদ্যোক্তা শাহেদুল ইসলাম (হেলাল) বলেন, বহুমুখী পাটপণ্য খাতে অনেক বেশি মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। বিদেশে এক টন কাঁচাপাট বিক্রি করলে দাম পাওয়া যায় ৭০০ ডলার। এক টন সুতা বিক্রি করলে পাওয়া যায় এক হাজার ডলার। আর এক টন বহুমুখী পাট পণ্য রফতানি করলে পাওয়া যায় পাঁচ হাজার ডলার।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এক টন সুতা তৈরি করতে প্রতিমাসে গড়ে ৫-৭ জন লোক লাগে। প্রচলিত পাটকলে এক টন বস্তা তৈরি করতে প্রতিমাসে গড়ে ১০-১২ জন লোক লাগে। আর প্রতিমাসে এক টন বহুমুখী পাট পণ্য তৈরি করতে লোক লাগে ২০ থেকে ৫০ জন।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিটি ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, পাটের সবচেয়ে কমদামী বহুমুখী পণ্য শপিং ব্যাগ। এক টন শপিং ব্যাগ রফতানি করলে পাওয়া যায় চার হাজার ডলার। আর ভাল মানের পাটপণ্য রফতানি করে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
তবে প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এ সুযোগ নিতে পারছে না বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশি দেশ ভারত এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের প্রযুক্তি পাটের বস্তা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশের পাটশিল্পের রূপান্তর অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এদেশে পাট শিল্পের যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। ওই সময় বিশ্ববাজারে পাটের বস্তার চাহিদা ছিল। ফলে পাটের বস্তা তৈরির প্রযুক্তি দিয়েই দেশের পাটশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর দেশের অন্যতম বহুমুখী পাট পণ্য ছিল কার্পেট। এ শিল্প প্রায় ১৫ বছর টিকে ছিল। ডিজাইন পরিবর্তনসহ অন্য কারণে একের পর এক কার্পেট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সত্তরের দশকের শেষদিকে শুরু হয় অপর বহুমুখী পণ্য পাট সুতা। দুই হাজার সাল পর্যন্ত এ শিল্প দাপটের সঙ্গে চললেও, বর্তমানে এ সুতার আন্তর্জাতিক বাজারও পড়তির দিকে।
পাটপণ্যের বৈচিত্র্য আনতে যে ফেব্রিকসের বৈচিত্র্য দরকার, এখানে সরকারের কোন পদক্ষেপ নেই। এর ফলে পাটপণ্যে চূড়ান্ত বৈচিত্র্য আসছে না। বাংলাদেশে উন্নত লেমিনেশন, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং পদ্ধতি নেই। এখানে উন্নতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবমুখী এ্যাকশন প্ল্যান প্রয়োজন। স্বল্প সময়ে কিভাবে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো যায়, সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দুই হাজার সালের শুরুতে বহুমুখী পাটপণ্যের প্রসার শুরু হয়। কিন্তু বড় মিলগুলো পাটের এ বহুমুখীকরণে এগিয়ে আসেনি। পাটের এ বহুমুখীকরণে এগিয়ে এসেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা (এসএমই)। এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতে দেশে বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছে এ পাটপণ্য তৈরির সঙ্গে। ফলে ধীরে ধীরে প্রসার ঘটছে এ সম্ভাবনাময় খাতের। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাট থেকে কাগজ, কাঠ, ট্রাভেল ব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, কুশন, ল্যাম্পশেড, টেবিল ক্লথ, গার্ডেনিং র‌্যাঞ্জ, নকশা করা শপিং ব্যাগ, লন্ড্রি বাস্কেট, ফ্লোরম্যাট ও বিভিন্ন ধরনের ঘর সাজানোর উপকরণ ও পোশাক তৈরি করছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা মানসম্পন্ন পাটপণ্য তৈরি করে বিদেশেও রফতানি করছে।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাটপণ্য বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। ফলে পাটের ব্যবহার শুধু বস্তা, চট, দড়ি আর কার্পেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পাট এখন ফ্যাশন ও বিলাসী পণ্যের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে পাট দিয়ে নানা ধরনের ইয়ার্ন ফাইবার ও ফেব্রিক জাতীয় শতাধিক পণ্য উৎপাদন করছে। ফাইবার জাতীয় পণ্যের মধ্যে রয়েছে জুট কম্পোজিটস, পেপার, পেপার প্রোডাক্টস, পাল্প, মেডিকেয়ার টেক্সটাইলস, নন-ওভেন প্রোডাক্টস উইপস, সেলুলোজ, বন্ডিং মেটেরিয়ালস, ফ্লোর টাইলস, সিএমসি, এমসিসি, টেকনিক্যাল ফাইবারস, প্যানেলস, সিটস ইত্যাদি। ইয়ার্ন জাতীয় পাটজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে ডায়েড ইয়ার্ন, ফাইনার ইয়ার্ন, পলিসড ইয়ার্ন, ফেন্সি ইয়ার্ন, কোর ইয়ার্ন, ফিউজড ইয়ার্ন, কেবল ইয়ার্ন, নিটেট ব্যাগ, হামক, স্যান্ডেল, জুতা, জুতার বিভিন্ন অংশ ইত্যাদি। এ ছাড়া পাটের তৈরি ফ্রেবিক জাতীয় পণ্যের মধ্যে রয়েছে চেকড ফেব্রিক, লাইট ফেব্রিক, ডিজাইনড ফেব্রিক, ট্রিটেট ফেব্রিক, লেমিনেটেড ফেব্রিক, ইউনিয়ন ফেব্রিক, প্রিন্টেট ফেব্রিক, গিফট রঙ, সুটকেস, ব্রিফকেস, সেমিনার ব্যাগস, ফাইলস, ফোল্ডার ইত্যাদি।
পাট দিয়ে এতসব পণ্য তৈরি হলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের অভাবে বাংলাদেশ এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে না। সময়ের পরিবর্তনে বিশ্ববাজারের চাহিদারও পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ববাজারের চাহিদা, ক্রেতাদের পছন্দ ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশে যে ধরনের প্রযুক্তি বিকাশের প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। তা সত্ত্বেও বহুমুখী পাটপণ্যের উদ্যোক্তারা নিজেরই প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে এখাতের প্রসার ঘটাতে ভূমিকা রাখছেন।
বাংলাদেশের উদীয়মান রফতানি খাত হচ্ছে বহুমুখী পাটপণ্য। পাটকে কেন্দ্র করে আবার সোনালী সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তা এ বহুমুখী পাটপণ্যকে ঘিরেই। এ সম্ভাবনার কারণে দেশেও বাড়ছে পাটপণ্য তৈরির ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশে যে পণ্যটি সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় সেটি হলো পাট। আর এ কারণেই নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আগ্রহ পাটের প্রতি। বহুমুখী পাটপণ্য তৈরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (এসএমই) প্রধান সমস্যায় পড়ে কাঁচামাল নিয়ে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাটপণ্য তৈরি করতে অল্প পরিমাণে কাঁচামাল প্রয়োজন। বড় মিলগুলো স্বল্প পরিমাণে কাঁচামাল বিক্রি করতে চায় না। উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জুট ডাইভাসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) ইতোমধ্যে দেশের ছয়টি স্থানে কাঁচামাল ব্যাংক করেছে। এর মধ্যে একটি ঢাকায় বিজেআরআই ভবনে। অপরগুলো টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, রংপুর, নরসিংদী ও যশোরে স্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকায় বিজেআরআই ভবনে কাঁচামাল ব্যাংক যাকে পাটপণ্য বহুমুখীকরণ সেবাকেন্দ্র বলা হয়। এটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কেন্দ্রটিতে অনেক ধরনের কাঁচামাল রয়েছে। এখান থেকে বিনা লাভে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে কাঁচামাল বিক্রি করা হয়। নবেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস সময় হচ্ছে এ কেন্দ্রের পিক সময়। সারাবছর ধরে উদ্যোক্তারা আসলেও, এ সময়টাতে উদ্যোক্তারা কাঁচামাল নিতে বেশি আসে। প্রতিমাসে ১২শ’ প্রতিষ্ঠান এখান থেকে কাঁচামাল ক্রয় করে।
তবে এসব কেন্দ্র থেকে একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কাঁচামাল পাওয়া যায় না। বড় অর্ডার পেলে উদ্যোক্তাদের দৌড়াতে হয় মিলগুলোর কাছে। মিলগুলোতে লাইন দিয়ে কাঁচামাল নিতে হয়। আবার নেয়ার পর দেখা যায়, ওই কাপড়ের মাখঝানে ছেঁড়া-ফাটা থাকে। তাই বহুমুখী পাটপণ্য তৈরির জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সময়মতো মানসম্পন্ন কাঁচামালের ব্যবস্থা করতে হবে।
বহুমুখী পাটপণ্যের উদ্যোক্তা বার্থা গীতি বাড়ৈ বলেন, ‘একেবারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এ ব্যাংক ঠিক আছে। কিন্তু বড় অর্ডার পেলে ব্যাংক বড় আকারের চাহিদা মেটাতে পারে না। আবার সোজা পথে গেলে কাঁচামাল পাওয়া যায় না। একটু অন্যভাবে গেলেই মেলে কাঁচামাল।’
তিনি বলেন, বড় অর্ডার পেলে কাঁচামালের জন্য যেতে হয় বিজেএমসিতে। বিজেএমসির মিলগুলো থেকেও লাইনম্যানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে কাঁচামাল নিতে হয়। অনেক সময় বিজেএমসি থেকে নেয়া কাপড়ের ভেতর ছেঁড়া-ফাটা পাওয়া যায়। তাই মিলগুলো থেকে সময়মতো মানসম্পন্ন কাঁচামালের ব্যবস্থা করতে হবে।’
বার্থা গীতি বাড়ৈ বলেন, পাটশিল্পের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এ কারণে পাটখাতে বিপণন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কিছু ব্যক্তি স্বার্থের কারণে এ খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য তিনি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, বিপণন ব্যবস্থা জোরদার, বিজ্ঞানীদের সুুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।
এ কেন্দ্রে যাঁরা কাজ করছেন তাদের পর্যবেক্ষণ হলো- নতুন নতুন উদ্যোক্তারা এখন বেশি আসছে পাটপণ্য তৈরি করতে। বিশেষ করে যাঁরা আগে লেদার বা সিনথেটিকের পণ্য তৈরি করতেন তারাও এখন পাটপণ্য তৈরি করতে এখান থেকে কাঁমাচাল নিতে আসছে। আবার স্থানীয় বায়িং হাউসগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় গার্মেন্টসগুলোও তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাটপণ্য রফতানির দিকে যাচ্ছে। এটাকে কাজে লাগাতে পারলে বিদেশে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যাবে। তবে কাঁচামাল ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিকভিত্তিতে পরিচালনা করা গেলে বহুমুখী পাটপণ্যের আরও প্রসার ঘটবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এ ব্যাংকগুলো পরিচালনা করা দরকার। এজন্য এসএমই সংগঠনকে জোরদার করতে হবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও বাজার উন্নয়নে তাদের কোন সংগঠন নেই। বর্তমানে পাট খাতে পাঁচটি সংগঠন আছে। কিন্তু এগুলোতে তারা সদস্য হওয়ার শর্ত পূরণ করে না। এক্ষেত্রে তাদের একটি সংগঠন তাদের বহুমুখী পাটপণ্যের উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করতে পারে।
নুতন উদ্যোক্তাদের পাটপণ্য তৈরির ক্ষেত্রে আগ্রহ আছে। এ আগ্রহের কারণ হলো এ শিল্পের সব কাঁচামাল হাতের নাগালের মধ্যে। পুঁজি বিনিয়োগও অনেক কম। তাই এ আগ্রহকে কাজে লাগাতে হলেও সংগঠনের খুব প্রয়োজন। পাটপণ্যের বহুমুখীকরণে সাহায্য করতে অনেক বিদেশী এনজিও ও সংস্থা ফান্ড নিয়ে বসে আছে। তারা প্রচলিত জুটমিলকে সাহায্য করতে চায় না। তারা মনে করে, ওখানে সাহায্য করা মানে তাদের অর্থ পানিতে যাওয়া। তারা ক্ষুদ উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে চায়। কিন্তু সংগঠনের অভাবে ওই অর্থ গ্রহণ করা যাচ্ছে না। ওই অর্থ নেয়া গেলে নতুন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজাইন উন্নয়ন, বাজারজাতকরণে সাহায্য করা যেত।
এ প্রসঙ্গে দেশের অন্যতম জুট এসএমই উদ্যোক্তা শাহেদুল ইসলাম (হেলাল) বলেন, বাংলাদেশ জুট ডাইভাসরসিটি ম্যানুফ্যাকচারার্স এ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন নামে এ সংগঠনের রেজিস্ট্রেশনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ঝুলে আছে। এ ব্যাপারে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে এ সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা উচিত। বিশেষ করে এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রীর ত্বরিত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সরকার বিজেএমসির কর্নফুলী জুটমিলে এসএমই’র জন্য একটি কাঁচামাল ব্যাংক করার ঘোষণা দিয়েছে। দ্রুত এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করা উচিত।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুটমিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হুমায়ুন খালেদ বলেন, আমরা কর্নফুলী জুটমিলকে লিজ গ্রহীতার কাছ থেকে ছাড়িয়ে এনে মিলটিকে বহুমুখী পাটপণ্যের কাঁচামাল উৎপাদনের উপযোগী করছি। এ মিলে শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বহুমুখী পাটপণ্যের কাঁচামাল তৈরি করা হবে। এজন্য পাটপণ্যের এসএমই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আমি বৈঠকও করেছি। তাদের কি ধরনের কাঁচামাল প্রয়োজন তা জেনে নিয়ে সে ধরনের কাঁচামাল উৎপাদন করা হবে চট্টগ্রামের কর্নফুলী জুটমিলে।
উদ্যোক্তারা বলছে, পাটের দামের ওপর কাঁচামালের দাম নির্ভর করে। দাম বেশি হলে এসএমই সেই কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিক্রি করতে পারবে না। এজন্য সরকার ওই মূল্যের ওপর ভর্তুকি বা ব্যাকোয়ার্ড লিংকেজের জন্য ইনসেনটিভ দিতে পারে। অবশ্য সরকার বর্তমানে বহুমুখী পাটপণ্যের উন্নয়নে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইনসেনটিভ দিচ্ছে। তবে এ নগদ সহায়তা যথেষ্ট নয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজাইন উন্নয়ন, পণ্যের মান যাচাই, নতুন বাজার সৃষ্টি, পণ্যের প্রচার ইত্যাদি প্রয়োজন। এসব ব্যাপারে সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। পাঁচ থেকে দশ বছর এ সহায়তা দিলে এ খাতটি দাঁড়িয়ে যাবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।
বহুমুখী পাটপণ্যের সম্প্রসারণে কাজ করছে পাট মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন নতুন সংস্থা জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)। এ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক খন্দকার মোখলেসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, যেসব এসএমই উদ্যোক্তা পাটপণ্য বহুমুখীকরণ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত তাদের মূল চাহিদা হচ্ছে- নতুন ডিজাইন, পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, পণ্য বাজারজাতকরণ। এসব চাহিদা জেডিপিসি পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না। তবে জেডিপিসি তাদের নানাভাবে সহায়তা করছে। বিশেষ করে যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে সহায়তা করছে। বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলা করে তাদের পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এসএমই’র প্রধান চাহিদা কাঁচামাল। এজন্য জেডিপিসি দেশের ছয়টি স্থানে কাঁচামাল ব্যাংক করেছে। এগুলো এখন পূর্ণ উদ্যোমে কাজ করছে। এখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী উদ্যোক্তারা কাঁচামাল নিতে পারছে। ঢাকায় কাঁচামাল ব্যাংকে প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার কাঁচামাল বিক্রি হয়। ঢাকার বাইরের গুলোতে এক থেকে দুই লাখ টাকার কাঁচামাল বিক্রি হয়।’
খন্দকার মোখলেসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে এসএমই উদ্যোক্তাদের সব ধরনের কাঁচামাল আছে। কিন্তু এগুলো এক ছাতার নিচে নেই। কাঁচামালের মধ্যে এসএমইর চাহিদা হলো-কাপড়, ডায়িং ও লেমোনেশন সুবিধা। এগুলো দেশে আছে, কিন্তু এক জায়গায় নেই। বা এক কেন্দ্রিক করার উদ্যোগ নেই। এগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে পারলে উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবে। এতে উৎপাদিত পাটপণ্যের দামও কমে আসবে।
তিনি বলেন, কাঁচামাল প্রাপ্তির ছাতা হিসেবে বিজেএমসি কাজ করতে পারে। কারণ বিজেএমসির এ সুবিধা আছে। যদিও তাদের সব মেশিনপত্র অতি পুরনো। এক্ষেত্রে তাদের মেশিনপত্র যুগোপযোগী করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘পাটপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক্সেসরিজ প্রাপ্তিরও সমস্যা আছে। পাটপণ্যের জন্য বোতাম, চেইন, বকলেস ইত্যাদি এক্সেসরিজের প্রয়োজন হয়। এসব এক্সেসরিজ মানসম্পন্ন ও সহজলভ্য করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশেই পাটপণ্যের বিশাল বাজার আছে। শুধু রফতানির ওপর নির্ভর না করে এ বাজারকে কাজে লাগাতে পারলেই পাট খাতের চেহারা পাল্টে যাবে। সরকারী অফিস-আদালতে যদি পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা যায় তাহলে দেশেই পাটপণ্যের বিরাট বাজার গড়ে উঠতে পারে।’
জেডিপিসি সূত্র জানায়, পাটপণ্য বহুমুখীকরণে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য জেডিপিসি নিয়মিত দক্ষতার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। কিন্তু সমস্যা হলো তাদের স্বীকৃত কোন প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল/মডিউল নেই। নিজেরা আনঅফিসিয়ালি একটি ম্যানুয়েল তৈরি করে নিয়েছে। তাই দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকার অনুমোদিত ম্যানুয়েল দরকার। এটা জরুরীভিত্তিতে সরকারকে করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে পাট কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে পাটের অনেক জিনিস তৈরি হচ্ছে। বিদেশেও বহুমুখী পাটপণ্যের প্রচুর অর্ডার আছে। কিন্তু সহায়তার অভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তা সরবরাহ করতে পারছে না। এজন্য বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) নীতিগত সহায়তা দেয়া দরকার। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য উৎসাহিত করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘পাটপণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত এসএমইগুলো বর্তমানে ঋণ ও কাঁচামাল সমস্যায় ভুগছে। তাদের জন্য জরুরীভিত্তিতে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত। সে সঙ্গে তাদের কাঁচামাল প্রাপ্তি সহজলভ্য করার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।’
এ প্রসঙ্গে পাট সচিব ফণীভূষণ চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন ও প্রচারের জন্য আলাদা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। বহুমুখী পাটপণ্য এখন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনাময় খাত। উন্নত দেশগুলো পরিবেশ সচেতন হয়ে উঠায় আমাদের প্রাকৃতিক তন্তু পাটের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ খাতের সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের সর্বরকমের সহায়তা প্রদান করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে পাটমন্ত্রী মুহাম্মদ ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক বলেন, পাট নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আমাদের এ্যাকশন নেয়া শেষ হলেই আশা করছি, পাট খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, ‘পাট হলো আমাদের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে। অন্য জিনিস বিলীন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পাট কোন দিন বিলীন হতে দেয়া যাবে না।’
এ প্রসঙ্গে পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, ‘এখন পাট দিয়ে শুধু বস্তা তৈরির যুগ শেষ হয়ে এসেছে। পাট দিয়ে এখন অনেক জিনিস তৈরি হচ্ছে। পাটকে আমাদের সেদিকে নিয়ে যেতে হবে। পাটকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বহুমুখী পাটপণ্যের দিকে আমাদের যেতে হবে। আমরা এজন্য যা যা করার দরকার তাই করব।’
এ প্রসঙ্গে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘পাট দিয়ে এখন সুন্দর সুন্দর পণ্য তৈরি হচ্ছে। চীন পাটের স্যুটের কাপড়, পর্দার কাপড়, সোফার কাপড় ইত্যাদি তৈরির মেশিন আবিষ্কার করেছে। আমরা সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাব।’
তিনি বলেন, পাটের নতুন সম্ভাবনা হচ্ছে বহুমুখী পাটপণ্য। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন কাউন্সিলকে ঢেলে সাজাতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যা কাঁচামাল, ডিজাইন, প্রচার প্রভৃতি। নতুন প্রকল্পে এ বিষয়গুলোর প্রতি জোর দেয়া হবে। এক্ষেত্রে আমরা পাটভিত্তিক তৈরি পোশাকের দিকে জোর দেব। এটা করতে পারলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ এ পণ্যের একচেটিয়া (মনোপলি) বাজার দখল করতে পারবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তাই এ সুযোগকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। বর্তমানে বিজেএমসির ২৭টি মিল আছে। এর মধ্যে ১৫টি মিলকেই বিএমআরআই করে বহুমুখী পাটপণ্যের কাঁচামাল তৈরির উপযোগী করা হবে।’