চার তরুণের যান্ত্রিক ডুবুরি

নৌপথে দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের অনুসন্ধানে রিমোট চালিত স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস তৈরি করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির [এআইইউবি] চার শিক্ষার্থী।

দেশে প্রায়ই নৌদুর্ঘটনা ঘটে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় উদ্ধার কার্যক্রম প্রত্যাশামতো চালানো যায় না। এতে করে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে নৌপথে দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের অনুসন্ধানে স্বল্প খরচে বানানো যায় স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস। ‘টেক-ডুবুরি’ নামের স্বয়ংক্রিয় এমন রোবটিক ডিভাইস তৈরি করে নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির [এআইইউবি] চার শিক্ষার্থী। তারা হলেন মোহাম্মদ আবু ফাত্তাহ,প্রসূন বিশ্বাস,সজীব দাশ ও মিরাজ মুস্তাকিম।প্রচলিত রোবটিক্স নিয়ে না পড়েও শুধু আগ্রহ এবং আবিষ্কারের নেশায় চড়ে নির্মাণ করে ফেলেছেন পানির নিচে কাজ করতে সক্ষম ডিভাইস যাকে রোবট সাবমেরিন নামেও ডাকা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় রোবট-সাবমেরিনের মূল পরিকল্পনা করেন ফাত্তাহ। পরবর্তী সময়ে এ প্রকল্পে যোগ দেন অন্যরা। চারজনে মিলে ৮০ হাজার টাকার তহবিল গড়ে শুরু করেন রোবট-সাবমেরিন তৈরির মিশন।
তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগ থেকে সদ্য অনার্স শেষ করা তরুণ প্রকৌশলী আবু ফাত্তাহ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস পেপার তৈরি করতে গিয়ে সহপাঠী প্রসূন বিশ্বাস, সজীব দাশ এবং মিরাজ মুস্তাকিম মিলে বাস্তবেই তৈরি করে ফেলেন এই পর্যবেক্ষক রোবটটি। পিভিসি পাইপ দিয়ে রাজধানীর ধোলাইখাল থেকে নিজেরাই এর বডি তৈরি করেছেন। এর ওজন ১৩ কেজি। ৩ ফুট লম্বা এই ডিভাইসটি তৈরিতে তাদের খরচ হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু এই মানের আন্ডারওয়াটার রোবটিক্স হিসেবে প্রচলিত ডিভাইস আরওভি [রিমোটলি অপারেটেড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল] কিনতে খরচ পড়ে দুই হাজার ডলারের মতো!
এ সম্পর্কে উদ্ভাবক দলের সদস্য সজীব বলেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ধার অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং স্বল্প খরচে যেন তা করা যায় সে দিকটা মাথায় রেখেই আমরা রোবট সাবমেরিন তৈরির চিন্তা শুরু করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে থাকতে আমাদের বিভাগের সুপারভাইজার ড. কামরুল হাসানের সহযোগিতায় অল্প দিনের প্রচেষ্টাতেই ল্যাব টেস্টে আমরা সফল হয়েছি। তবে প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফলতা পাননি তারা। মিরাজ জানান,প্রথম প্রচেষ্টায় টিন শিট দিয়ে তৈরি ডিভাইসটি পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে নিজেদের তৈরি মোটর দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা হলে পানি নিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় ফের সলিল সমাধি ঘটে রোবট সাবমেরিনটির। তবে ‘বাইলজ পাম্পে’ সফল হয় এই চার তরুণের স্বপ্ন। রিমোট নিয়ন্ত্রিত ডিভাইসটিতে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মতো একটি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। মাইক্রো কন্ট্রোলিং সিস্টেম ব্যবহার করে জ্বালানি খরচ কমানো হয়েছে। এটি একজন দক্ষ ডুবুরির মতো কাজ করতে পারে। সামনের বাধা সম্পর্কে আগাম বার্তা দেওয়া এবং একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও পানির তাপমাত্রার রেকর্ড করতে পারে। সামনে-পেছনে, ওপর-নিচে চলাচল করা ছাড়াও এর মধ্যে স্থাপিত লাইট-ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও পাঠাতে সক্ষম। এ ধরনের ডিভাইস নির্মাণ সম্পর্কে ফাত্তাহ বলেন, বিদেশে পানির নিচে কার্যক্রম পরিচালনায় রিমোট নিয়ন্ত্রিত ডিভাইস [আরওভি] এবং স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস এওভি নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। তবে এ ধরনের কাজে পারদর্শী রোবটের দাম সর্বনিম্ন ৭০ হাজার ডলার। ফলে চমৎকার এসব রোবটিক ডিভাইস দেশে ব্যবহার করা দুঃসাধ্য। মূলত ডিসকভারি চ্যানেলে কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে এমন ডিভাইস বানাতে দেখে আমরাও স্বপ্ন দেখি পানির নিচে কাজ করবে রিমোটচালিত এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস বানাব।
প্রসূন বললেন, প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আমরা আরওভির কারিগরি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। আর ডিভাইস তৈরির শুরুতে সমস্যায় পড়ি ডিভাইসের আকার কেমন হতে পারে তা নিয়ে। কেননা আমরা যে মডেল চিন্তা করে রেখেছি তাতে আমাদের সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স পার্ট এবং পাওয়ার থাকবে আরওভি স্ট্রাকচারের ভেতরে, তাই আমাদের স্ট্রাকচার পানিরোধী এবং এটি পানির চাপ সহ্য করার মতো শক্ত হতে হবে। সব কিছু হিসাব করে পিভিসি পাইপকেই আমরা আমাদের ডিভাইসের কাঠামো তৈরিতে উপযুক্ত মনে করি। তবে পাঁচ মিটার নিচে গিয়ে পানির চাপ নিতে ব্যর্থ হয় আমাদের ডিজাইন করা থ্রাস্টারগুলো। এ সমস্যা এড়াতে বিদেশ থেকে পানিরোধী মোটর আনতে হয়। ফলে আমাদের খরচ একটু বেড়ে যায়। এরপর আমরা মনোযোগ দিই কন্ট্রোল সিস্টেমের দিকে, কন্ট্রোল সিস্টেম চিন্তা করতে গিয়ে আমরা সবচেয়ে সুবিধাজনক হিসেবে পাই মাইক্রোকন্ট্রোলার সিস্টেমকে, মাইক্রোকন্ট্রোলার বেসড কন্ট্রোল সিস্টেমের সুবিধা হলো এগুলো মোটামুটি সহজলভ্য, অনেক সহজে প্রোগ্রাম করা যায় এবং এগুলোর পাওয়ার কনজাঙ্কশন অনেক কম।
টর্পেডোর মতো দেখতে এই যান্ত্রিক ডুবুরি আপাতত পানির নিচে ৫ মিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান চালাতে পারে। শক্তিশালী মোটর ব্যবহার করা হলে আরও গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান বা উদ্ধার তৎপরতা চালাতে সক্ষম বলে জানান উদ্ভাবক দলের সদস্য। আগামীতে ডিভাইসটিতে পানির তলদেশে চাপ ও গভীরতা শনাক্তকরণের উপযোগী সেন্সর লাগানো হবে বলে জানান ফাত্তাহ। বললেন, এ ডিভাইসের উন্নয়ন ও বিশেষায়ণ করা হলে তা নদীতে ডুবে যাওয়া নৌযান দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা যাবে। রোবটিক হ্যান্ড যুক্ত করে পাওয়ার এবং থ্রাস্টার বাড়িয়ে প্রয়োজনে নদী বা সমুদ্রে নিখোঁজ বস্তু বা প্রাণী খুঁজে বের করে তীরে টেনে আনতে সক্ষম হবে। থ্রাস্টার বাড়ানো হলে স্রোতের বিপরীতেও চলতে পারবে। আপাতত রিমোট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ভবিষ্যতে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানো সম্ভব হবে। তবে গবেষণা এবং ডিভাইসটির মানোন্নয়নে দরকার আর্থিক সহায়তা। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো উদ্যোক্তা চার তরুণের পাশা দাঁড়ালে তাদের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে। পাশাপাশি এই চার তরুণের স্বপ্ন নৌপথে আমাদের নতুন দিশারিও হতে পারে।