বৈদেশিক সহায়তায় রেকর্ড ॥ দাতাদের আস্থা ফিরছে

০ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ৬শ’ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে
০ বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে ২.৮ বিলিয়ন ডলার, জাপান ১.২ ও এডিবি ১.৫ বিলিয়ন

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করায় চলতি অর্থবছরে সর্বোচ্চ সহায়তা দিচ্ছে উন্নয়ন সহযোগীরা। তাদের কাছ থেকে এ যাবত কালের সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাবে বলে আশা করছে সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে এর পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৬শ’ কোটি মার্কিন ডলার। আগামী জুন মাসের মধ্যেই বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া গত চার বছর বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। যা তার আগের চার বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

সরকারী সম্পদ ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারী কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা, নতুন নতুন দাতা দেশ যুক্ত হওয়া এবং বাংলাদেশে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দাতাদের বোঝাতে পারার কারণেই বৈদেশিক সহায়তা বেড়েছে। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আরাস্তু খান জনকণ্ঠকে বলেন, আমি আশাবাদী অর্থবছর শেষে প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আমরা পূরণ করতে পারব। কেননা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ অর্থবছর চুক্তি হবে মোট ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাপানের সঙ্গে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া চীন, সৌদি ফান্ড, কুয়েত ফান্ড, ইউএন সিস্টেমসহ অন্য দাতাদের কাছ থেকে বাকি প্রতিশ্রুতি পাওয়া সম্ভব হবে। কাজেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখন কোন সমস্যা দেখছি না।

বাংলাদেশের বৈদেশিক সহায়তা বাড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম সম্প্রতি বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রভাব অন্যকোন উন্নয়ন প্রকল্পে পড়বে না। বাংলাদেশের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সবসময়ই ভাল এবং এটি চলমান থাকবে। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে যে নতুন করে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশে। সুতরাং বাংলাদেশ আমাদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশিয়া প্যাসিফিক ডিপার্টমেন্টের পরিচালক চ্যাংইয়ং রিহী ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পারফর্মেন্স নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন নই। ৬ শতাংশের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি বড় বিষয়। যদিও গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রবৃদ্ধি সামান্য কমতির দিকে। কিন্তু এখন সেটি স্বাভাবিকতার দিকে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে ফিরে আসবে। তিনি বলেন, ৬ শতাংশ অথবা ৬ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি এটি খারাপ পারফর্মেন্স নয়।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও অন্য দাতাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল পরবর্তীতে সেসব আশঙ্কা কেটে যায়। সরকারের দায়িত্বশীলদের তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সফল নেগোসিয়েশনের ফলেই উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইআরডির তুলানামূলক এক হিসাব এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

রেকর্ড বৈদেশিক সহায়তা বিষয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল, তারই ফল হচ্ছে এই বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধি পাওয়া। এক্ষেত্রে মুডিসের যে ক্রেডিড রেটিং তাতেও বলা হয়েছে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ভাল। গত তিন বছর ধরে তাদের রেটিংয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চিত্র ফুটে উঠছে। এ অবস্থা ধরে রাখা গেলে আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক সহায়তা আরও বৃদ্ধি পাবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্র জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে বৈদেশিক সহায়তার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ১ হাজার ৯৬৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। যা তার আগের চার অর্থবছরের তুলনায় ১১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

গত বিএনপি জোট সরকাররের সময়ে ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর পর্যন্ত দাতাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ৯৩৩ কোটি মার্কিন ডলারের। অন্যদিকে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বর্তমান সরকারের চার বছরে ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত দাতারা ছাড় করেছে ৮৯১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। যা তার আগের চার বছরের তুলনায় ২৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেশি। বিএনপি জোট সরকারের চার বছরে অর্থাৎ ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০০৮-০৯ অর্থবছর পর্যন্ত দাতারা ছাড় করেছে ৭১০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) থেকে প্রকাশিত সামষ্টিক অর্থনৈতির ওপর এক প্রতিবেদনেও গত চার বছরে বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার মোট প্রতিশ্রুতি ছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর অর্থছাড় হয়েছে মোট ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ দশমিক ১ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে মোট অর্থছাড় হয়েছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ শূন্য দশমিক ৭ এবং অনুদান ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সচিব আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারী সম্পদ ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারী কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা, নতুন নতুন দাতা দেশ যুক্ত হওয়া এবং বাংলাদেশে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা দাতাদের বোঝাতে পারার কারণেই বৈদেশিক সহায়তা বেড়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের খুবই কম সময় লেগেছে। ফলে এটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অর্থবছরভিত্তিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট প্রতিশ্রুতি এসেছে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন এবং অনুদান ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময়ে অর্থছাড় হয়েছে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০১০-১১ অর্থবছরে মোট প্রতিশ্রুতি ছিল ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ছাড় হয়েছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর মধ্যে ঋণ ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময় অর্থছাড় হয়েছে মোট ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর মধ্যে ঋণ ২ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে ছাড় হয়েছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং অনুদান শূন্য দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তা বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সূত্র জানায়, বর্তমানে অর্থায়নে নতুন উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউরোপীয় ইনভেসমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি)। সম্প্রতি এই উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পাওয়ার সিস্টেম এক্সপানশন এ্যান্ড ইফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় ৮৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া চীন ও জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যাপক সহায়তা বাড়াচ্ছে।