নতুন প্রযুক্তির টারবাইন আবিষ্কারে বায়ু বিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা

শুধু ফেনীর উপকূল এলাকায় ৫ হাজার মে.ও. উৎপাদন সম্ভব
 
রশিদ মামুন ॥ নতুন প্রযুক্তির টারবাইন আবিষ্কারের দেশে বায়ুবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড বলছে শুধু ফেনীর উপকূলবর্তী ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে অন্তত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব। সারাদেশের অন্য উপকূলীয় এলাকায় হাজার হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুত উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন দরকার বায়ুবিদ্যুতখাতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা। 
একই ভৌগোলিক এলাকায় অবস্থিত ভারত বায়ু থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট, চীনে ৯০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বায়ুপ্রবাহ এবং আবহাওয়ায় আমাদের অনেক মিল রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। 
বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং গবেষণা ও উন্নয়ন পরিদফতরের পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ শফিক উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, এখন প্রতি সেকেন্ডে বাতাসের গতিবেগ (কাট ইন স্পিড) দুই মিটার (২ মিটার/সেকেন্ড) হলেই বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারে এমন টারবাইন আবিষ্কার হয়েছে। ফেনীতে আমরা তিন দশমিক পাঁচ মিটার/ সেকেন্ড গতিবেগের বাতাস দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করছি। এর থেকেও ভাল প্রযুক্তি এসেছে। যেসব দেশে বাতাসের গতিবেগ কম তারা এসব টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদন করছে। আমেরিকাতে এ ধরনের টারবাইন ব্যবহার হচ্ছে। আমরাও একই টারবাইন ব্যবহার করে বায়ু বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারি। 
ফেনীর দশমিক ৯ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি আট বছর বন্ধ থাকার পর গত দু’মাস আগে চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ কিলোওয়াট আওয়ার (ইউনিট) বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে। পিডিবি সূত্র জানায়, বিদ্যুত কেন্দ্রটির জন্য পৃথক সঞ্চালন লাইন থাকলে এখনই তিন গুণ বিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুত সমিতির ১১ কেভির বিতরণ লাইনকে বিদ্যুত কেন্দ্রটির সঞ্চালন লাইন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি এবং মার্চে দেখা গেছে এ লাইনটি ১৩৮ বার ট্রিপ করেছে। লাইনের ওপর বাড়তি চাপ পড়া ছাড়াও সামান্য বাতাসে লাইনটি ট্রিপ করে যায়। এর ফলে ওই মাসে বিদ্যুত কেন্দ্রটিও ১৩৮ বার বন্ধ করতে হয়েছে। প্রত্যেকটি বিদ্যুত কেন্দ্রর জন্য পৃথক সঞ্চালন লাইনে গ্রিডে বিদ্যুত দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও ফেনীর বায়ু বিদ্যুত কেন্দ্রটির ক্ষেত্রে তা না থাকায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। প্রায় আট বছর পর বিদ্যুত কেন্দ্রটি চালু করার পর পিডিবি উৎপাদন দেখে আরও বায়ুবিদ্যুতে আরও বেশি উৎসাহী হয়েছে। 
পিডিবি সূত্র জানায়, ফেনীর বিদ্যুত কেন্দ্রটির কথা চিন্তা করে গ্রিড সংযুক্ত একটি সরবরাহ লাইন করার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান কেন্দ্রটির পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থাপিত অন্য কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুত সরবরাহ করা হবে। এখন পর্যন্ত ফেনীর মুহুরিড্যাম এলাকাকে বায়ুবিদ্যুত উৎপাদনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট স্থান মনে করা হয়। এখানে ২০ বর্গ কিলোমিটারের একটি উপকূলীয় জমি রয়েছে। যার অধিকাংশ এলাকাই ফাঁকা। তবে এখানে সামান্য কিছু বাড়িঘর রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ করা হলে এখান থেকে কমপক্ষে পাঁচ হজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব। মুহুরিড্যাম এলাকা থেকে গ্রিড লাইনের দূরত্বও মাত্র ১৪ কিলোমিটার। কাজেই এখানে নতুন করে কোন গ্রিড লাইনও নির্মাণ করতে হবে না।
ভারতীয় কোম্পানি মেসার্স রিজেন পাওয়ারটেক গত দেড় বছর ধরে উইন্ড ম্যাপিং (বায়ু মানচিত্র তৈরি) করছে। দেশে বায়ুর গতিবেগ পাঁচ মিটার প্রতি সেকেন্ড বলে রিজেন তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। তবে রিজেন আশা করেছিল এখানে বায়ু গতিবেগ সব সময় আট মিটার প্রতি সেকেন্ডের বেশি থাকবে। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসের গতিবেগ যত বেশি হবে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ তত কম হবে। গত পাঁচ বছর আগেও শুধু গ্যাস দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন হতো। এখন বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এখন তেলচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে (ফার্নেস অয়েলে) ১৪ থেকে ১৬ টাকা প্রতি ইউনিট এবং (ডিজেল) ২০ থেকে ২২ টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুত কেনা হচ্ছে। এমন কি সৌরশক্তি দিয়ে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন করলেও প্রতি ইউনিট ১৪ টাকার নিচে পড়বে না। সেখানে বাতাসের গতিবেগ কাট ইন স্পিড দুই মিটার প্রতি সেকেন্ডে হলে বায়ুবিদ্যুত উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ হবে আট থেকে ১০ টাকা। নবায়নযোগ্য বিদ্যুত হওয়ায় এখানে জ্বালানি আমদানিরও প্রয়োজন পড়বে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এখন ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল হরিজেন্টাল টারবাইন এর পাশাপাশি ভার্টিক্যাল টারবাইন (বড় আকৃতির টারবাইন) নিয়ে নানা রকম গবেষণা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন প্রযুক্তি এলে উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে। 
পিডিবি বলছে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল রিনিউবল এনার্জি ল্যাবরেটরি (এনআরইএল) বাংলাদেশের চারটি স্থানে ইউন্ডমাস বসিয়ে বায়ু মানচিত্র তৈরি করবে। তারা কক্সবাজারের ইনানী বীচ, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড, চাঁদপুর এবং নাটোরের লালপুরে টাওয়ার স্থাপন করবে। এ ছাড়া পিডিবি পৃথকভাবে কুয়াকাটা, পতেঙ্গা, টেকনাফ, শরণখোলা এবং লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে টাওয়ার স্থাপন করবে। এতে করে সারাদেশের বায়ুর গতিপ্রকৃতি জানা যাবে।
পিডিবি সূত্র জানায়, রিজেন পাওয়ারটেক মাত্র একবার বিদ্যুত বিভাগকে আংশিক তথ্য দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে তারা বিদ্যুত বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইউনিটকে নিরুৎসাহিত করছে। আবার ফেনীর মুহুরিড্যাম এলাকার সম্ভাবনাময় উপকূলীয় ভূমি বরাদ্দ চাইছে। সম্প্রতি এক চিঠিতে বিদ্যুত বিভাগকে জানায়, ‘রাইট অব ফাস্ট রিফিউজ’ তারা না নিলে অন্যদের দিতে পারেন এমন শর্তে এই জমি বরাদ্দর অনুরোধ করেছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বিদ্যুত বিভাগকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করার কথা থাকলেও তা করে না কোম্পানিটি। এমনকি তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষুণœ হতে পারে এমনটা মনে করে নিয়মিত পিডিবির পর্যবেক্ষণের অনুরোধেও কোম্পানিটি রাজি হয়নি। 
বিদ্যুত বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, উইন্ড ম্যাপিংয়ের জন্য একটি টাওয়ার স্থাপনে মাত্র ৮৭ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। সামান্য এ বিনিয়োগের জন্য অন্যদের ওপর নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত নয় বলে মনে করেন তাঁরা। সাধারণত বায়ু বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে তিন বছরের উইন্ড ম্যাপিংয়ের প্রয়োজন হয়। তবে এক বছরের ইউন্ড ম্যাপিং (বায়ু প্রবাহের গড় গতিবেগ ও প্রবাহের দিক) থাকলেও চলে। বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প গ্রহণের আগে উইন্ড ম্যাপিং দেখতে চান। বায়ুবিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ। অন্য জ্বালানির বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতি ওয়াটে ব্যয় হয় এক দশমিক চার ডলার সেখানে বায়ুবিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যয় হয় দুই দশমিক পাঁচ ডলার। সঙ্গতকারণে এসব ক্ষেত্রে বুঝে শুনে প্রকল্প গ্রহণ করতে চান। কিন্তু আমাদের দেশে পূর্ণাঙ্গ কোন ম্যাপিং না থাকায় বিনিয়োগকারীরা উৎসাহী হচ্ছে না। 
সূত্র জানায় পিডিবি বায়ু থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের উপকূলীয় এলাকায় এসব বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। রিজেনের সঙ্গে চুক্তির সময় জানানো হয়, সমীক্ষায় যে স্থানটি সবচেয়ে উপযোগী বিবেচিত হবে সেখানেই ১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার পরীক্ষামূলক একটি কেন্দ্র নির্মাণ করবে রিজেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে রিজেনকে কোন প্রকার আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে না। সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য, উপাত্ত বিদ্যুত বিভাগ ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিটি ১০০ মিটার উচ্চতার টাওয়ার স্থাপন করেছে তারা। প্রায় দেড় বছর ধরে তারা বায়ুপ্রবাহের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছে। 
বায়ুবিদ্যুত বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মোঃ ফজলুর রহমান এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনার কথা বলে আসছি। ফেনীতেই পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বায়ুবিদ্যুত কেন্দ্র হতে পারে। তিনি বলেন, মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাস সময় ভাল বায়ুর প্রবাহ পাওয়া যায়। বাতাসের কাট ইন স্পিড ৫ মিটার/ সেকেন্ড হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদনে খরচ পড়ে ১২টা, আর কাট ইন স্পিড দুই থেকে ছয় মিটার/ সেকেন্ড এর মধ্যে থাকলে দাম পড়বে আট থেকে ১০ টাকা। আমরা রেন্টালে এর থেকে বেশি দামে বিদ্যুত কিনছি। এক্ষেত্রে বায়ু দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনকে সাশ্রয়ী মনে করেন তিনি।