বুয়েটের আলোকচ্ছটা

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্ব আসরে আবার নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ রাখল। ইউএন-হ্যাবিট্যাট আয়োজিত ‘আরবান রিভাইটালাইজেশন অব ম্যাস-হাউসিং’ নামে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিশ্ব পর্যায়ে শীর্ষ তিনে স্থান করে নিয়েছে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থীদের দল ‘শাইনিং স্টারস’। এই দলটি একই সঙ্গে অর্জন করেছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রথম হওয়ার গৌরব। চার মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় ৩৫টি দেশের ৯৭টি দল অংশ নেয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও ভারত।
কী ছিল ‘শাইনিং স্টারস’-এর পরিকল্পনায়? বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নের মডেল দাঁড় করিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দিল বুয়েটের এই শিক্ষার্থীরা। ঢাকার বস্তির বিদ্যমান অবাসযোগ্য অস্বাস্থ্যকর অবস্থাকে দূরে ঠেলে উল্টো ওই স্বল্প পরিসরেই পরিবেশবান্ধব ঘরবাড়ি নির্মাণ ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে তাঁদের নকশা ও পরিকল্পনায়।
প্রতিযোগিতার কথা প্রথমেই নজরে আসে তাসফিয়া তাসনীমের। পরবর্তী সময়ে তিনি একই বিভাগের তাসনীম ফিরোজ, ফয়সাল বিন ইসলাম, ফারিবা সিদ্দিক, পৌষালী ভট্টাচার্য্য ও সুমাইয়া তাবাসসুমকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘শাইনিং স্টারস’ দল।
প্রকল্পটির জন্য বেছে নেওয়া হয় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ১৬ দশমিক ৫ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কল্যাণপুরসংলগ্ন ‘পোড়াবস্তি’ এবং ‘বেলতলা বস্তি’কে। ঠিক এ রকম বস্তি বেছে নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তাসনীম বলেন, ‘যেহেতু আমাদের দেওয়া পরিকল্পনা পুরস্কৃত হলে ইউএন হ্যাবিট্যাটের ফান্ডিং করার কথা, তাই শুরু থেকেই আমাদের মাথায় ছিল এমন একটি স্থান বেছে নেওয়া, যেখানে ফান্ডিংটা এলাকার বাসিন্দাদের উপকারে আসে।’
স্বাভাবিকভাবেই বহুল সমস্যায় জর্জরিত এই বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যাকে মাথায় রেখে তারা পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প খরচে টিকে থাকে এমন বস্তু (বাঁশ) দিয়ে বাসা তৈরির রূপরেখা দেন। একই সঙ্গে স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর কিছুটা বাড়তি রোজগারের কথা মাথায় রেখে জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার করে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বাস্তবায়নের জন্য ছোট পরিসরেই গবাদি পশুপালন, মৎস্য চাষ, টুকটাক কৃষিকাজ ও হস্তশিল্প প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য দলটি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে। পাশাপাশি বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতাও যে তাঁদের এত দূর আসতে সহায়তা করেছে, সেই কথাও জানান তাসফিয়া।
সুমাইয়া বলেন, ‘আমরা বস্তিগুলোতে গিয়ে তাদের চাহিদার কথা ও সীমাবদ্ধতার কথা শুনেছি। সেগুলো সমন্বয় করে একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করাই ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’
অসাধারণ এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ফারিবা বলেন, ‘এই ধরনের সাফল্যে আমরা আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা পাই। প্ল্যানিং নিয়ে আমরা নিজেদের চিন্তাভাবনা সবার সামনে তুলে ধরতে পারি, যা আমাদের ভবিষ্যতে কাজের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।’
অপর দিকে পৌষালীর মতে, ‘এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পেরেই আমরা অনেক খুশি ছিলাম। কিন্তু এত বড় সাফল্য পাব, ভাবিনি। সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলের কাজ দেখে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।’
অপর দিকে ফয়সালের মতে, যদি প্রকল্পটি ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে হাউস বিল্ডিংয়ের আওতায় থাকা এই খাস জমিগুলোর ব্যবহারকারীরা হাউস বিল্ডিংকে মাসিক ভিত্তিতে কিছু টাকা দিতে পারবে। এতে করে বস্তি উচ্ছেদের যে প্রবণতা, সেটাও কমে আসবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার ও ইউএন হ্যাবিট্যাট সর্বাগ্রে এগিয়ে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা এই উদীয়মান নগর পরিকল্পনাবিদের।
উল্লেখ্য, এ প্রতিযোগিতায় স্পেনের ‘ইম্প্রভিস্টস’ দলটি প্রথম ও মরক্কোর ‘ক্যাসাব্ল্যাঙ্কা’ দল দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড আরবান ফোরামে ১১ এপ্রিল প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ের ফল ঘোষণা করা হয়।