ব্যবসা বাড়ছে অভ্যন্তরীণ রুটে

আকাশপথে দেশের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন বাড়ছে। মানুষের আয় বৃদ্ধি, সড়কপথে বাড়তি সময়, যানজটসহ নানা কারণে উচ্চবিত্তদের পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষও উড়োজাহাজে চড়ছে। এতে তিন বিমান সংস্থায় প্রতিদিনই যাত্রীর চাপ বাড়ছে। যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আসছে আরো দুটি দেশি বিমান সংস্থা ‘ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস’ ও ‘এপিক এয়ার’। এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও অভ্যন্তরীণ রুটে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টিকিটের মূল্য কমবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে তীব্র প্রতিযোগিতায় এত বিমান সংস্থা সফলভাবে টিকে থাকা কঠিন হবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

জানা গেছে, এত দিন অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবসা বাড়ানোর জোরালো উদ্যোগ ছিল না। কিন্তু যাত্রী বাড়ায় এখন অভ্যন্তরীণ রুটেও মনোযোগী হচ্ছে দেশীয় তিন বিমান সংস্থা। অভ্যন্তরীণ রুটে মাত্র লাখ দুয়েক মানুষ বিমানে চলাচল করলেও এখন শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সাত লাখ মানুষ বিমানে যাতায়াত করছে। প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করে।

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে ২০০৯ সালে অভ্যন্তরীণ বিমান যাত্রীর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৯৬ হাজার ৬১৭, ২০১০ সালে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৩৩, ২০১১ সালে পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৯৫০, ২০১২ সালে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ১০৮ এবং ২০১৩ সালে ছয় লাখ ৪৮ হাজার ১৯ জন। প্রতিবছরই অভ্যন্তরীণ যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতের শীর্ষ এই বিমান সংস্থা ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ২১ হাজার ১৭৪ জন যাত্রী পরিবহন করে, যা ২০১৪ সালের একই সময়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ২৯ জন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ হাজার ৫৫ জন, বেড়ে ২০১৪ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে এসে ২৫ হাজার ৮৩০ জন হয়। ২০১৩ সালের মার্চে ইউনাইটেডের যাত্রী সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৬৯৯ জন, যা ২০১৪ সালের মার্চে ৩০ হাজার ৩০৮ জনে দাঁড়ায়। অভ্যন্তরীণ রুটে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে নভো এয়ার।

২০০৭ সালের ১০ জুলাই অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রা শুরু করে সব অভ্যন্তরীণ রুটে (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, সৈয়দপুর, ঈশ্বরদী ও বরিশাল) ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। বর্তমানে ১১টি এয়ারক্রাফট রয়েছে ইউনাইটেডের বিমানবহরে।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের এজিএম (মার্কেটিং সাপোর্ট অ্যান্ড পিআর) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটের সবটাতেই আমরা ফ্লাইট পরিচালনা করছি। তিনি বলেন, আরো বিমান কম্পানি এলে অভ্যন্তরীণ বাজার খুবই প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখানে টিকে থাকতে হলে ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সির পাশাপাশি যাত্রীসেবা বাড়াতে হবে।

কামরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ১০-১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে টিকিটের মূল্য কমানোই একমাত্র উপায় নয়। বিমানের জ্বালানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা খুবই কঠিন গেছে। তাই ‘প্রাইস ওয়ার’ শুরু হলে নতুন বিমান সংস্থাগুলোর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রা শুরু করে। সম্প্রতি উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ফ্লাইট বিপর্যয়ে পড়েছে রিজেন্ট। জানতে চাইলে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন ম্যানেজার এস এম রিয়াজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের একটি এয়ারক্রাফট সিভিল এভিয়েশনে নিয়মিত চেকআপে আছে, আরেকটিতে কিছুটা ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এ মাসে আমাদের কিছুটা সমস্যা হয়েছিল, তবে তা ঠিক হয়ে গেছে।’

রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘আরো দুটি এয়ারলাইনস আসা আমাদের জন্যও ভালো খবর। তারা নতুন পণ্য, সেবা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাজারে আসবে। এতে যাত্রীরাই উপকৃত হবে। আবার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমরাও দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে আরো ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করব।’

ইউএস-বাংলা গ্রুপের মালিকানায় আসছে ‘ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস’। আগামী মাসে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে নতুন এই বিমান সংস্থা। জানতে চাইলে ইউএস-বাংলা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক শাহজাহান সাজেদুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিগগিরই যাত্রা শুরু করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। প্রথমে দুটি ড্যাশ ৮ কিউ ৪০০এস এয়ারক্রাফট দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং যশোর রুটে আমরা বিমান পরিচালনা করব। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশাল রুটে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।’

শাহজাহান সাজেদুর আরো বলেন, ‘বর্তমানে চাহিদা বাড়ায় আরো এয়ারক্রাফট প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আরো কয়েকটি বিমান কম্পানি অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবসা শুরু করলে যাত্রীরা উপকৃত হবে। নতুন বিমান সংস্থা হিসেবে যাত্রীদের জন্য আকর্ষণীয় ভাড়ার পাশাপাশি নতুন পণ্য ও সেবা দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকবে।

এদিকে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সাবেক সিইও ইমরান আসিফ ইক্যুয়িটি বিনিয়োগের মাধ্যমে এ বছরের মধ্যেই ‘এপিক এয়ারলাইনস’ বাজারে আনার লক্ষ্যে কাজ করছেন। তিনি এখন এপিক এয়ারের সিইও। ইমরান আসিফ বলেন, ‘এ বছরের শেষ নাগাদ আমরা কার্যক্রম শুরু করব। আমরা যে টার্গেট মার্কেটের কথা চিন্তা করছি, তা অর্জন করা সম্ভব। কারণ বর্তমানে বছরে অভ্যন্তরীণ যাত্রীর সংখ্য ছয় লাখের বেশি। তিন বছর ধরেই ১০ থেকে ১২ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীর সংখ্যা দুই লাখেরও কম ছিল, তা এখন ছয় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তাই এই বাজারে আরো বিমান সংস্থার প্রয়োজন আছে।’

তিনি বলেন, আকাশপথে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সেভাবে বাড়েনি। সব এয়ারলাইনসের গড় ভাড়া সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি, যা তিন বছর আগে তিন হাজার টাকা ছিল। যেহেতু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি তাই ভাড়া বেড়েছে। আরো দুটি বিমান কম্পানি এলেও সরবরাহ পুরোপুরি মিটবে না, তবে ভাড়া কিছুটা কমবে। সরবরাহ ঘাটতি কাটলে নূ্যনতম ২০ শতাংশ ভাড়া কমা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

নতুনদের টিকে থাকার কৌশল কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন ভাড়া অ্যাডজাস্ট হবে, তখন বর্তমান নতুন যাত্রী হিসেবে বিলাসবহুল বাসের যাত্রীরাও আসবে। এতে অভ্যন্তরীণ মার্কেট অনেক বড় হবে। বাংলাদেশে বাজেট এয়ারলাইনসের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে এপিক এয়ারের সিইও বলেন, "বাজেট এয়ারলাইনসগুলো অনেক বড় মার্কেট অপারেট করে। বাংলাদেশের মতো এত ছোট মার্কেটে সত্যিকারের ‘লো কস্ট মডেল’ দাঁড় করানো কঠিন। এর পরও আমরা লো কস্ট ক্যারিয়ার হিসেবেই যাত্রা শুরু করব। আমরা নভেম্বর নাগাদ বাজারে আসার টার্গেট করছি।"

দুটি নতুন বেসরকারি বিমান সংস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান পরিচালনা শুরু করতে যাচ্ছে। জানা গেছে, ৭০ সিটের একটি প্রপেলর ভাড়ায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিমান। এটি পেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান। এ ছাড়া যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশালে ফ্লাইট শুরুর পরিকল্পনা করছে রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থা।