গার্মেন্টসে এক বছরে অনেক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি – নিউইয়র্ক টাইমস

রানা প্লাজা ট্রাডেজির এক বছর পরেও শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে বলে মনে করে দেশটি। এ ছাড়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় বাংলাদেশের রফতানি খাতে সীমিত প্রভাব ফেলছে। বার্তা সংস্থা এএফপি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাক খাত উন্নয়নে এ্যালায়েন্স ও এ্যাকর্ড জোট পরস্পর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রানা প্লাজা ট্রাজেডির বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমরা এখনও বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। শ্রমিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ব্যাপারে বাংলাদেশের অনেক কাজ করার আছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিশেষ করে শ্রম আইনের বিভিন্ন দিক, রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ পর্যবেক্ষণে পরিদর্শক নিয়োগের বিষয়টির মতো অনেক কাজ করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে।
তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ কর্মকর্তা আরও বলেন, তবে আমরা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষ্য করেছি। তার মধ্যে রয়েছে শ্রমিক ইউনিয়নের সংখ্যা বৃদ্ধি, অগ্নিনির্বাপণ ও কাঠামোগত মান নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়, বেশিসংখ্যক পরিদর্শক নিয়োগ ও এ সেক্টরের সহজে তথ্য পাওয়ার জন্য ডাটাবেস তৈরি।
২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের এক বছরপূর্তি উপলক্ষে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ২০১২ সালে তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকা-ে একশ’ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ার মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর কারখানাগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবনের নিরাপত্তার বিষয়ে নজর দেয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু অগ্নিনির্বাপণ ও ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টিই দেখছে না, একই সঙ্গে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে শ্রম আইন প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় দেশটির রফতানি খাতে সীমিত প্রভাব ফেলছে। তবে জিএসপি সুবিধা স্থগিত বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।
তিনি বলেন, এ সুবিধা ফিরে পেতে আমরা একই সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে একটি জিএসপি কর্ম পরিকল্পনাও দিয়েছি। সেখানে কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়গুলো প্রয়োগ করলে আমরা জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করার ব্যাপারে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, গত বছরের শেষের দিকে আমরা বাংলাদেশের কারখানাগুলোর ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা করেছি। চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশ সরকার কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করছে। তবে তাদের আরও অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। আমরা এখনই জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল করতে পারছি না। চলতি বছরে মে-জুনের দিকে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি পর্যালোচনা করবে বলে জানান তিনি।
‘নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ’ শিরোনামে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক খাত উন্নয়নে এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স জোট কাজ করছে। সম্প্রতি নিরাপত্তার ঘাটতির জন্য একটি কারখানা বন্ধ করে দেয় এ্যাকর্ড। কারখানাটি বন্ধ করে দেয়ার ফলে বেকার হন আড়াই হাজার শ্রমিক। এসব শ্রমিকের বেতনের কোন দায়িত্ব এ্যাকর্ড নেয়নি।
উত্তর আমেরিকাভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন এ্যালায়েন্সের সমালোচনা করছেন এ্যাকর্ড সদস্যরা। এ্যাকর্ডের অন্যতম সদস্য ও ওয়ার্কার্স রাইট কনসোর্টিয়ামের নির্বাহী পরিচালক স্কট নোভা বলেছেন, এ্যালায়েন্সের অনেক পরিদর্শন দ্রুততার সঙ্গে সমাপ্ত করা হয়েছে। এসব পরিদর্শন মানসম্মত নয়। এ্যালায়েন্সের পরিদর্শন করা কারখানায় এ্যাকর্ড মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম সোয়েটার কারখানা ধসের পর ৬৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। তবে তখনও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কোন উন্নতি হয়নি। এরপর গত বছরের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১২৯ শ্রমিক প্রাণ হারান। সে ঘটনা পোশাক শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়। এ ছাড়াও তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকা-ে ১১২ জনের প্রাণহানি ঘটে। এসব কারণে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ব্র্যান্ডগুলো পোশাক কারখানার শ্রম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাপ দেয়। কিন্তু এ উদ্যোগে যোগদানের পরিবর্তে পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো স্পষ্টত এখন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে একটি হলো এ্যাকর্ড। অপরটি এ্যালায়েন্স। এ্যাকর্ডে রয়েছে এইচএন্ডএম, ক্যারিফোর, ম্যাঙ্গোর মতো বহু ইউরোপিয়ান ব্র্যান্ডসহ ১৪টি আমেরিকান কোম্পানি ও আরও দেড়শটি প্রতিষ্ঠান। আর এ্যালায়েন্সে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ২৬টি প্রতিষ্ঠান। এ্যালায়েন্স সদস্যদের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, টার্গেট, কল’স প্রভৃতি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ্যাকর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এ্যালায়েন্সের পরিদর্শন অত্যন্ত দুর্বল। আর এ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এ্যাকর্ডের তুলনায় অনেক বেশি কারখানা পরিদর্শন করেছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস গত সোমবার একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্স যখন পাঁচ হাজার কারখানার মধ্যে দুই হাজার কারখানা পরিদর্শন করবে। তখন বাকি তিন হাজার কারখানা খারাপ অবস্থায় থাকবে। বাকি থাকা কারখানায় গোপনে বায়িং হাউসগুলো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যাদেশ পাঠাবে।
অবশ্য পোশাক কারখানা বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডারা ও রৌওর্ক ভিন্নমত মত করে বলেছেন, এ্যার্কড ও এ্যালায়েন্স দু’পক্ষই কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে। তাদের প্রচেষ্টা অভূতপূর্ব। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা যেটা করছেন, সেটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তিনি আরও বলেন, দুই জোটের প্রতিযোগিতা ভাল কাজের জন্যই। এতে করে সত্যিকার অর্থেই পোশাক খাতের উন্নয়ন হবে বলে তিনি মনে করেন।

স্টাফ রিপোর্টার