টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন: এক বছরে পোশাকশিল্পে ৯১ শতাংশ সাফল্য

রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর গত এক বছরে পোশাক শিল্পে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ওই ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনার পর শ্রমঘন এ শিল্পোন্নয়নে সরকার, গার্মেন্ট মালিক, বিদেশি ক্রেতাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ শুরু করার পর এক বছরে ৯১ শতাংশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন : প্রতিশ্রুতি ও অগ্রগতি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে হোটেল অবকাশে সংবাদ সম্মেলনে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন টিআইবির চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ও নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত বছরের ৩১ অক্টোবর পোশাক খাত নিয়ে টিআইবির প্রকাশিত অন্য এক প্রতিবেদনে ৬৩ ধরনের সুশাসনের সূচক চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওইসব সূচকের আলোকে ওই সময় বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ১০২টি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। সব মিলিয়ে গড়ে ৯১ শতাংশ উদ্যোগের অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে, ৬০ শতাংশ উদ্যোগের বিভিন্ন পর্যায়ের অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে ৯ শতাংশ উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রানা প্লাজা ধসসহ অন্যান্য ক্ষতিকর ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গত এক বছরে পোশাক খাতের সাফল্য ব্যাহত হবে। গত বছরের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক খাতে
নজিরবিহীন নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। দেখা দিয়েছিল বহুমুখী অনিয়ম ও দুর্নীতি। ওই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার, পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, কারখানার মালিক ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো গত এক বছরে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বক্তারা বলেন, পোশাক শিল্প খাত উন্নয়নে মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন, কল্যাণ তহবিল গঠন, শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করার মধ্য দিয়ে এ খাতের মৌলিক পরিবর্তন নিশ্চিৎ করতে হবে। দেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি যেন শোষণ-বঞ্চনার খাত হিসেবে থেকে না যায়। এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা_ মালিক, সরকার, বিদেশি ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ খাত দেখভালের জন্য কর্তৃপক্ষ গঠন অথবা একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার উপনির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. শরীফ আহমদ চৌধুরী ও অ্যাসিস্টেন্ট প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা।
অনুষ্ঠানে সুলতানা কামাল বলেন, পোশাক খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখনও অনেক কিছু বাকি আছে।
নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রানা প্লাজার মতো একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি হতেই হবে। অন্যথায় এ খাতের সাফল্য ব্যাহত হবে। তিনি গৃহীত ইতিবাচক উদ্যোগসমূহ সুশাসনের প্রতিকারে প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করলেও, টেকসই পরিবর্তনের জন্য তা অপর্যাপ্ত। সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্রস্তাবিত পোশাক পল্লীতে কারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, প্রতি পণ্যে মাত্র তিন সেন্ট করে বাড়তি মূল্য দিলেই তা দিয়ে রেমিডেশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে পারবেন মালিকরা। পরিদর্শন কার্যক্রমেও বায়ারদের ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বায়ারদের সংগঠন প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৬২৬টি কারখানার মধ্যে মাত্র ৮০টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬২৬টি কারখানার মধ্যে ২৪৭টির জরিপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রেতাদের পরিদর্শনে এ পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়েছেন ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে ৫ লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুত হবেন। বায়ার ফোরাম থেকে ১৩টি কারখানা বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। তাছাড়া ৫৬টি কারখানার অর্ডার বাতিল করা হয়েছে। বাতিলকৃত অর্ডারের আর্থিক মূল্য ১১০ মিলিয়ন ডলার। ২৮টি ব্রান্ড প্রতিষ্ঠান রানা প্লাজায় কাজ করলেও তার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।