ভারতে পোশাক রফতানি বাড়ছে

এম শাহজাহান ॥ শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধার আওতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে পোশাক রফতানি বাড়ছে। এ বছর দেশটিতে ১ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৫৩ দশমিক ৩৯ ভাগ। গত বছর এ হার ছিল ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া ওই বছরে ভারতে পোশাক রফতানি হয় ৭ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। তবে রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাবনাময় বড় বাজার হিসেবে রফতানির এ পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন উদ্যোক্তারা। এ লক্ষ্যে বিপুল সম্ভাবনাময় এ বাজারে রফতানি বাড়াতে এবার শুধু ভারতীয় ক্রেতাদের নিয়ে পোশাক মেলার আয়োজন করতে যাচ্ছে বিজিএমইএ। আগামী ২২-২৩ মে দু’দিনব্যাপী বিজিএমইএ ভবনে এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
জানা গেছে, ১২৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে পোশাকের বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারতের বাজার থেকে তৈরি পোশাক রফতানি বাবদ আয় এসেছে ৭ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১১-১২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তবে এ বছর প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫২ শতাংশ। শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধার আগের বছর ২০১০-১১ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
উদ্যোক্তাদের মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা সত্ত্বেও এখনও কিছু কিছু পণ্যে ৪২ শতাংশ শুল্ক দিয়েই রফতানি করতে হয়। তারা জানান, ভারতে ফুল হাতা গেঞ্জি, হাইনেক গেঞ্জির চাহিদা ব্যাপক কিন্তু এসব পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় নেই। ৪২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে এসব পণ্য ভারতে রফতানি করতে হয়।
জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারতের পোশাক মেলায় এবার ৪৭টি স্টলে উৎপাদিত গার্মেন্টস পণ্য প্রদর্শন করবেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ওই দেশের শতাধিক ক্রেতাকে বাংলাদেশে আনার চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এর আগে ভারতের ক্রেতাদের নিয়ে এ ধরনের কোন মেলা করা হয়নি। কিন্তু দিন দিন ভারতের বাজারের গুরুত্ব বাড়ছে। আর তাই এবার শুধু তাদের নিয়ে পোশাক মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
জানা গেছে, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হলে পোশাক রফতানি বাড়াতেই হবে। আর তাই নতুন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরই তোফায়েল আহমেদ সার্ক বিজনেস লিডার্স সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে যান। ওই সময় মূল কর্মসূচীর বাইরেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি ও সম্প্রসরাণে ভারতের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে ভারত সরকার ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ব্যাপারে ভারত সরকার এবং ওই দেশের ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে জানা যায়। ওই সময় ভারতের রাষ্ট্রপ্রতি প্রণব মুখার্জী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আনন্দ শর্মা, সার্ক চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ফিকি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
সূত্র মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা সত্ত্বেও বিভিন্ন অশুল্ক বাধায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। কেন্দ্রীয় পর্যায় ছাড়াও প্রাদেশিক পর্যায়ে বাধা দেয়া হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে এসব বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বাংলাদেশী পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে অনেক স্থলবন্দর ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না। মান যাচাইর সমস্যা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মোঃ আতিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, ১২৫ কোটি জনসংখ্যার ভারত বাংলাদেশী পোশাকের জন্য বিশাল সম্ভাবনার। প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের এই বাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে লিড টাইম বা পরিবহনের সময়। মাত্র দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে সেখানে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা এই বাজারের ওপর আরও গবেষণা করছি এবং একে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছি। আশা করছি এটি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রফতানি বাজার হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়ার পাশাপাশি এদেশের পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতেও ক্রেতারা আগ্রহী। এ কারণে নানামুখী সঙ্কটের মধ্যেও গত বছর নতুন প্রায় সোয়া ২শ’ নতুন কারখানা উৎপাদনে আসছে।
ফতানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি বাতিল, রানা প্লাজা ধস এবং তাজরীনের মতো আলোচিত ঘটনায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় বয়ে গেলেও এর কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি পোশাক শিল্পের বিনিয়োগে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ বোর্ড ও বিজিএমইএ’র দ্বারস্ত হচ্ছে ভারত এবং চীনের বিনিয়োগকারীরা। তবে বিজিএমইএ’র প্রবল আপত্তি রয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, তৈরি পোশাক শিল্প নয়Ñ বরং টেক্সটাইল, কম্পোজিট বা অন্যান্য ভারি শিল্প ও সেবা রফতানি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ হতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেলেই বন্ধ হওয়া পোশাক কারখানা কিনে নিচ্ছেন। কখনও যৌথ অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের পাশাপাশি এগিয়ে আছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ।
যদিও পোশাক শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বরাবরই এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে আসছেন। বিজিএমইএ ইতোপূর্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তৈরি পোশাক খাতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছে। তাঁরা বলছে, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিদ্যমান বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে যা থেকে এদেশের উদ্যোক্তারা বঞ্চিত। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী জনকণ্ঠকে বলেন, পোশাক শিল্পকে স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে। এখাতে কোন বিদেশী বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। বরং তাঁরা টেক্সটাইল এবং হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। এ ছাড়া রফতানিমুখী সেবা খাতেও বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সেবামুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।